শিলা নুর লম্বা লবিটার সামনে দিয়ে বারকয়েক আসা-যাওয়া করল। দুই-তিনবার কাশল। বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে কয়েকবার ঘড়ির দিকে তাকালো।
চব্বিশ তলা অ্যাপার্টমেন্টের এই ফ্লোরটা খুব সুন্দর করে সাজানো। চারটা ইউনিট মিলে সিঙ্গেল একটা ফ্লোর। প্রতি ছয়তলা পরপর এ রকম চারটা করে ফ্লোর। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিকে এভাবেই আর্কিটেকচারাল প্ল্যানটা দেওয়া হয়েছিল। এই বিশেষ চারটা ফ্লোর অফিসের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই ফ্লোরটা ভাড়া নিয়েছে ফিল্ম প্রডিউসার রওনক হাসান। তার অফিস হিসেবে গুলশানের এই আলিশান অ্যাপার্টমেন্টটা একেবারে লাগসই। লোকেশন, স্ট্যাটাস...সবকিছুই একদম মাপে মাপে মানানসই। ভীষণ রুচিশীল রওনক তার চাকচিক্যময় সিনেমাগুলোর মতোই অফিসটাকেও মনের মতো করে সাজিয়েছে।
লবির এক পাশের দেয়ালজুড়ে রওনক হাসানের সিনেমাগুলো থেকে নেয়া বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি। কোনোটা বিশাল ফ্রেমে বাঁধানো, কোনোটা বা ছোট ফ্রেমে। ছবির গুরুত্ব বুঝে সেগুলোকে সাজানোও হয়েছে বেশ কায়দা করে।
গত বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে রওনক। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে হাসি হাসি মুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখেও হাসি। ঝকঝক করছে ছবিটা। এই ছবিটা একেবারে মাঝখানে রাখা হয়েছে। সেটিকে ঘিরে অন্য ছবিগুলো সাজানো হয়েছে।
লবিজুড়ে বিশাল বিশাল চিনামাটির টবে বড় বড় সব ডেকোরেটিভ প্ল্যান্ট। উজ্জ্বল সবুজ পাতা। দেখলেই ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। মনে কেমন একটা শান্তি শান্তি ভাব চলে আসে। সিলিং থেকে নেমে এসেছে বিশাল ঝাড়বাতি। একটা কর্নারে ছোট একটি ঝরনাও আছে। ঝরনার নিচে নানা রকম ছোট-বড় পাথর। স্বচ্ছ পানিতে নেচে বেড়াচ্ছে সুন্দরী স্বর্ণালী মাছ।
শিলা ঘুরে ঘুরে লবির সাজসজ্জা দেখছে। মাঝে মাঝে উৎসুক চোখে তন্ময়ের দিকেও তাকাচ্ছে। রিসেপশনিস্ট তন্ময় তখন মন দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন অভিনেতার সাথে কথা বলছে। কী সব কাগজপত্র চেক করছে। তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটা সম্ভবত নতুন জয়েন করেছে। মেয়েটা পিট পিট করে শিলার দিকে তাকাচ্ছে। শিলা একটু হেসে আবার লবির চারপাশ ঘুরেফিরে দেখতে লাগল।
তন্ময় কথা বলার ফাঁকে আড়চোখে শিলা নুরের দিকে কয়েকবার তাকিয়েছে। চোখে চোখ পড়তেই পরিচিতের হাসি দিয়ে বলতে হয়েছে, ‘ম্যাডাম, ভালো আছেন? অনেকদিন পরে এলেন!’
শিলা তন্ময়ের সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল। এটুকু সম্বোধনেই হাসিমুখে সামনে এগোতে এগোতে বলল, ‘তোমরা না ডাকলে আসি কেমন করে? আগের মতো তো এখন আর খোঁজখবর নাও না!’
এই কথা ভুল না। একটা সময় ছিল যখন শিলা নুর ছিল সময়ের অন্যতম আবিষ্কার। নাম্বার ওয়ান সেনসেশন। সেই সময়টা খুব বেশি দূরেরও না। সম্ভবত দুই হাজার দশ-এগারো সালের দিকে। মোটে চৌদ্দ-পনেরো বছর আগের কথা। শিলা তখন সবে ইন্ডাস্ট্রিতে পা ফেলেছে। তেইশ-চব্বিশ বছর বয়স। চনমনে চেহারা। শরীরে মায়াময় হিল্লোল। কত প্রযোজক পরিচালক নাট্যকারের দল তখন শিলার পিছে পিছে ঘোরে! এক প্যাকেজ নাটকের নির্মাতা তো শিলাকে নাটকে নিয়মিত করানোর জন্য একটা আস্ত ফ্ল্যাটই তার নামে কিনে দিতে চাইল। বেচারার অবশ্য মনের আশা পূরণ হয়নি। নাটকে অভিনয় করেনি শিলা। তবে কিছু নামিদামি প্রডাক্টের বিজ্ঞাপন করেছে। সেইসব বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল সেই সময় সবার মুখে মুখে ফিরত।
ধূর্ত প্রযোজকের দল বিশাল অঙ্কের টোপ ফেলে শিলার জন্য। শিলা সবার ডাকে সাড়া দেয় না। খুব বেছে বেছে কাজ করে। রওনক হাসানও সেই সময় শিলাকে কাস্ট করে একটা ছবি তৈরির প্রজেক্ট হাতে নেয়। নিত্যনতুন সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়ে রওনক তখন থেকেই ইন্ডাস্ট্রির আলোচিত প্রডিউসার।
শিলার সুন্দর মুখশ্রী আর অপূর্ব দেহবল্লরীকে কাজে লাগানো যায় এমন একটা ছবির গল্পের সন্ধান করে রওনক। ছবিতে দুজন নায়ক, কিন্তু আসল নায়ক শিলাই! অর্থাৎ নারীপ্রধান ছবি। কেউ কেউ রওনক হাসানকে সাবধান করে বলেছিল, ‘আমাদের দেশের পাবলিক নারীপ্রধান ছবি দেখবে না! এত টাকাপয়সা ঢালছেন! শেষমেশ না সব পানিতে যায়!’
রওনক কারো কথায় কান দেয় না। তার মাথায় তখন শুধু শিলা ঘুরছে। একবার নিজের ছবিতে শিলাকে পার্মানেন্ট করে ফেলতে পারলেই তাকে আর পায় কে! রওনকের অলিখিত ‘বাঁধা’ নায়িকা হবে শিলা।
ছবিটা দারুণ হিট করেছিল। শিলার পারফরম্যান্স ছিল দেখার মতো। পারফরম্যান্স বলতে অবশ্য অভিনয়শৈলী মনে করার কোনো কারণ নেই। পোস্টারে যেসব ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, তাতে কেউই শিলার অভিনয় দেখতে সিনেমা হলে যায়নি। গিয়েছিল অন্য কিছুই দেখতে। আর তাদের সেই ইচ্ছে ষোলো আনা পূর্ণও হয়েছে। সবচেয়ে যেটা লক্ষণীয় ছিল তা হচ্ছে শিলার এক্সপোজ করতে পারার মানসিকতা। নাচতে নেমে সে অযথা ঘোমটা টেনে বসেনি। পরিচালক যেখানে যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই শিলাকে অর্থাৎ তার দেহবল্লরীকে একেবারে জুতসই মতো ব্যবহার করতে পেরেছে।
সিনেমা হলে ছবি মুক্তির পরে পরপর টানা তিন মাস ছবিটা হাউজফুল গিয়েছে। পত্রপত্রিকায় তখন একটাই শিরোনাম, শিলা। শিলা কী করে...কী খায়...কীভাবে ফিগার মেইন্টেইন করে...কতক্ষণ ঘুমায়...কার সাথে ঘুমায়...কিছুই বাদ যায় না।
অবশ্য সিনেমাতে অতিরিক্ত শরীর দেখানোর কারণে সমালোচনার তীরেও কম বিদ্ধ হতে হয়নি শিলাকে। সিনে ম্যাগাজিনগুলো রগরগে ছবি সহকারে শিরোনাম দেয়, ‘কোথায় যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি?’ ‘এই কি আগামী বাংলাদেশ?’
এখানে সেখানে রব ওঠে, ‘নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করার জন্যই কি এসব চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে?’
রওনক হাসান শিলাকে শান্ত থাকতে বলে। কোনো পরিস্থিতিতেই বেশি উত্তেজিত হওয়া যাবে না। চল্লিশ বছরের রওনক তখন বিবাহিত পুরুষ। দুই সন্তানের পিতা। আচার আচরণে পরিমিত। কোথায় কতটুকু প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয় ধরে ধরে শিলাকে শেখায় সে। শিলাও বাধ্য ছাত্রীর মতোই লেগে থাকে রওনকের সাথে। সম্বোধনটা তখনো আংকেল। রওনক শিলাকে বলে, ‘আংকেল ডাকলে তো নিজেকে বুড়ো বুড়ো লাগে শিলা! তুমি আমাকে ভাইয়া ডাকতে পারো না?’
‘ভাইয়া! আপনাকে? কেমন একটু উইয়ার্ড শোনায় না?’ নেকু নেকু গলায় বলে শিলা। সিনেমা হিট হওয়ার সুবাদে সে তখন হাওয়ায় ভাসছে।
রওনক চোখ থেকে চশমাটা খুলে বলে, ‘আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো তো, ভাইয়া ডাকতে কি খুব অসুবিধা হওয়ার কথা?’
শিলা তাকায় রওনকের চোখে। রওনকের চোখ তো তখন শিলার ওপর থেকে সরেই না! সেই মাদকতাভরা চোখে শিলা কত কিছুই দেখতে পায়। কিছু কিছু বোঝে। মনে মনে হাসে আর বলে, ‘বুড়োর ভাইয়া হওয়ার শখ কত!’
কিন্তু মুখে ঠিকই বলে, ‘ওকে ভাইয়া! এখন থেকে আপনাকে ভাইয়া বলেই ডাকব!’
‘উঁহু, আরেকটি কারেকশন। আমাকে তুমি বলতে হবে। আপনি বলা যাবে না।’
রওনক হাসান তখন শিলাকে নিয়ে আরো নতুন নতুন সিনেমার প্লট খুঁজে ফিরছে। চিত্রনাট্যকারদের মধ্যে থেকে সেরাদের কাছে গল্প চায় রওনক। সকাল দুপুর শিলার সাথে কথা হয়। চিত্রনাট্য নিয়ে আলোচনার অছিলায় প্রায়ই শিলাকে নিয়ে নিজের অফিসে মিটিং বসায় রওনক। শিলাকে একান্তে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি বলো গল্পটা তোমার কাছে কেমন লাগছে? এই চরিত্রে কি তুমি নিজেকে খুঁজে পাচ্ছ?’
চরিত্রে আবার নিজেকে কীভাবে খুঁজে পেতে হয়, শিলার সেটা জানা নেই। চোখ নাচিয়ে বলে, ‘তুমি খুঁজে পেলেই হবে! তোমার চোখ দিয়েই তো আমি দেখি!’