মাওলানা ইসমাইল রেহান
যেভাবে রচিত হলো 'মুসলিম উম্মাহর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস'
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
ইতিহাস এমন একটি বিষয়, যা একদিকে মলাটবদ্ধ করাও কঠিন, অন্যদিকে বিশ্লেষণ করাও জটিল। এ কারণেই মানুষ সাধারণত ইতিহাস গবেষণার পথ এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। অথচ সঠিক নীতি ও নির্ভুল পদ্ধতিতে ইতিহাস অধ্যয়ন করলে এর উপকারিতা অপরিসীম। ইতিহাস আমাদের সামনে শতাব্দীর অভিজ্ঞতাকে কয়েকটি পৃষ্ঠায় সন্নিবেশ করে তুলে ধরে। অতীতের আয়নায় বর্তমানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে এবং ভবিষ্যতের নিখুঁত পরিকল্পনা রচনার যোগ্যতা তৈরি করে। ইতিহাস আমাদের বন্ধুবান্ধব ও শত্রু-মিত্র চেনায়, জাতিগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব বোঝায় এবং তদানুযায়ী আচরণ করার ক্ষমতা তৈরি করে।
পাশ্চাত্য বিশ্বে অসংখ্য গবেষক ও লেখক ইতিহাসচর্চায় নিবেদিত। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে আরও শক্তিশালী করছে। বিপরীতে প্রাচ্যবিদদের' একটি বড় অংশ, তাদের প্রশিক্ষিত উদারপন্থী গবেষক এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত মতাবলম্বী লেখকরা ইসলামি ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। যার ফলে, আমরা আমাদের প্রকৃত ইতিহাস থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি। এমনকি আধুনিক শিক্ষিত তরুণদের অনেকেই এই মিশ্রিত, বিকৃত ২ দ্বীনের প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ছে। 10/50
এর সমাধান এই নয় যে, আমরা ইতিহাসকে বর্জন করব বা মানুষকে ইতিহাস পাঠে নিরুৎসাহিত করব। এর সমাধান হলো, ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তির জাল ছিন্ন করার লক্ষ্যে আমরা নিজেরা ইতিহাস গবেষণার সঠিক মানদণ্ড বজায় রেখে গবেষণায় হাত দেব। প্রমাণনির্ভর ও নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা করব।
এই লক্ষ্যে অধম নিজেও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিগত বারো বছর ধরে ইতিহাসের নিরীক্ষণ, বিশ্লেষণ ও বিন্যাসের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে কাজ করে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত যতটুকু কাজ হয়েছে,
তা তারিখে উম্মাতে মুসলিমা (৮) নামে বৃহৎ কলেবরে পাঁচ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। এতে পূর্ববর্তী নবীগণের জীবনী, সিরাতে নববী,
খিলাফতে রাশেদা, খিলাফতে উমাইয়া ও আব্বাসিয়া, উসমানি খিলাফত এবং ইসলামি আন্দালুসসহ বিভিন্ন মুসলিম রাজবংশের বিস্তৃত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। বড় সাইজের প্রায় সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ইতোমধ্যে প্রকাশের আলো দেখেছে এবং আলিম, বুদ্ধিজীবী ও উম্মাহর পুনর্জাগরণের প্রত্যাশী ব্যক্তিদের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। এই সিরিজের ষষ্ঠ খণ্ডের কাজও শীঘ্রই শুরু হবে। যেখানে উপমহাদেশের ইতিহাস এবং আধুনিক মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে
তবে এর পাশাপাশি ইতিহাসের এমন একটি প্রাঞ্জল গ্রন্থও সংকলন করা জরুরি ছিল, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পাঠদান করানো যাবে। কুরআন-সুন্নাহ অনুসৃত বিশুদ্ধ ইসলামি আকীদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ হবে।
বিগত তিন বছরে বহু আকাবির আলিম ও মাশায়েখ আমাকে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে উৎসাহিত করেছেন। ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে আমি রায়বেন্ডের ইজতেমায় উপস্থিত হই। এসময় ভারত থেকে আগত দাওয়াত ও তাবলিগের আকাবির মুরুব্বিদের সঙ্গে দেখা
সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে কুফর ও শিরকের ঘোর অমানি ইসলামের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল সত্যের আলো অজ্ঞ 12/50 ₫ তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমাদের প্রিয় নবী (ফিদাকা ইয়া রাসুলাল্লাহ) ইসলামের দাওয়াতের সূচনা করেন। আর এই দাওয়াতে সাড়া দিয়ে সেই সব সৌভাগ্যবান ও সত্যনিষ্ঠ মনীষীরাই তাঁর পাশে সমবেত হন, যাদের আমরা সম্মানের সঙ্গে 'সাহাবায়ে কেরাম' বলে স্মরণ করি।
রাসুলুল্লাহ সা.-কে মক্কা নগরী থেকে বের করে দেওয়া হলে মদিনার আনসাররা তাকে গভীর শ্রদ্ধায় বরণ করে নেন। মদিনায় প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দাওয়াতের পাশাপাশি জিহাদের ধারাও শুরু হয়। ফলত, মাত্র দশ বছরের মধ্যে সমগ্র আরবজুড়ে তাওহিদের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। মক্কা বিজিত হয়, লাত-উজ্জা ও হুবলসহ সব মূর্তি ধ্বংস করা হয় এবং মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করতে থাকে।
খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ইসলামের সৈনিকরা আরব উপদ্বীপ থেকে বেরিয়ে রোম ও পারস্যের নিরঙ্কুশ আধিপত্যকে ধ্বসিয়ে দেন এবং শত শত বছর ধরে নিপীড়িত মানবতাকে মুক্তি দিয়ে কেবল প্রকৃত রবের সামনে নত হওয়ার স্বাধীনতা উপহার দেন। কয়েক দশকের মধ্যেই এমন এক অনন্য সমাজ গড়ে ওঠে, যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব মানবতাকে গৌরবান্বিত করবে।
বিজয়ের ধারা বিস্তৃত হতে থাকলে ক্রমশ অভ্যন্তরীণ ফিতনাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। এটাই ছিল উম্মাহর ইতিহাসে প্রথম