জাহিদ হোসেন ফিরোজের লেখা “জল ও জলাধার ভাবনার স্রোতধ্বনি” বইটির চূড়ান্ত খসড়ার কপি হাতে পেয়ে সেটা ধীরে ধীরে পড়েছি। ধীরে ধীরে পড়ার কারণ হচ্ছে— প্রত্যেকটা চ্যাপ্টারই আমার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনাকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিচ্ছিল। স্বভাবত আমি খুব দ্রুত পড়ে থাকি। দ্রুত পড়লে বাক্যের ফাঁকে ফাঁকে কিছু কিছু শব্দ পড়া থেকে বাদ পড়ে যায়। এতে লেখাটি পুরো স্বাদ ঠিকমতো পাওয়া যায় না। সেজন্যই জনাব ফিরোজের লেখা ধীরে ধীরে পড়েছি।
লেখকের লেখার ভঙ্গি এবং বিষয়বস্তুগুলো আমাকে আকৃষ্ট করেছে। তার চিন্তা-ভাবনার সাথে বহুলাংশে আমার মতৈক্য প্রকাশ পেয়েছে। বইটির উৎসর্গ পৃষ্ঠা আমাকে প্রচণ্ডভাবে আকর্ষিত করেছে। আমি বিশ্বাস করি যে সাধারণ জনগন নদ-নদী প্রবাহের ধারা এবং গতি-প্রকৃতি খুবই ভালোভাবে এবং দক্ষভাবে বোঝেন। আমি বহু প্রকল্পে, প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট নদ বা নদীটিকে বোঝার জন্য স্থানীয় বৃদ্ধ কিংবা দায়িত্বশীল লোকজনের সাথে কথা বলেছি, অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি রিভার মেকানিক্স তারা খুবই ভালো বোঝেন। তারা নদীর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে পারেন, কিন্তু হয়তো তারা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না। কিন্তু আমি বহু সিদ্ধান্ত দিয়েছি তাদের জ্ঞানের উপরে সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে।
যেমন যমুনা সেতুর ডিজাইন কাজ শুরু হওয়ার আগে কর্তৃপক্ষ নদী শাসনের কাজ হাতে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভুয়াপুরের অভিজ্ঞ গ্রামবাসির ব্যাখ্যা শুনে সেই কাজ বন্ধ করতে সক্ষম হয়। পূর্বপাড়ের নদীরক্ষা বাধ নির্মাণ করার সময় এটির দৈর্ঘ্য আমি অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিলাম, যাতে ভুয়াপুর গ্রামটি ভূমি অধিগ্রহণের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং এই প্রকল্পের উপদেষ্টারা আমার সাথে সম্পূর্ণভাবে একমত হন।
একটি নদী শুধু পানি বহন করে না (লেখক জল শব্দটি ব্যবহার করলেও, আমার পছন্দ পানি) সঙ্গে সেডিমেন্টও বহন করে। এ দুটির সমন্বয়ে নদীর আকৃতি, প্রকৃতি অর্থাৎ জিওমরফোলজিক্যাল ক্যারেক্টারিস্টিক। এই দুটির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গত পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। সেডিমেন্ট ট্রান্সপোর্ট সংক্রান্ত বিদ্যা কয়েকজন গুরুর মধ্যে একজনের নাম হচ্ছে হ্যান্স আইনস্টাইন। তিনি প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জ্যেষ্ঠপুত্র।
উনিশশ পঞ্চাশ দশকের কথা বলছি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন তিনি। তিনি বর্তমান জি কে প্রোজেক্টের ইনটেক চ্যানেলটি ডিজাইন পর্যালোচনা করছিলেন। তার নজরে এলো প্রশস্ত পদ্মা নদীতে প্রচুর কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু এলোমেলোভাবে ছড়ানো-ছিটানো ভাবে যাচ্ছে না; বরং তিন-চারটি ধারায় অনেকটা লাইন করে একে-বেঁকে কচুরিপানাগুলো ভাটির দিকে যাচ্ছে। নদীতে পানি ঢাল বরাবর ভাটির দিকে প্রবাহিত হয়। কিন্তু নদীর প্রস্থ বরাবর একটি সেকেন্ডারি কারেন্ট থাকে, যা প্রমাণ হিসেবে কচুরিপানাগুলোকে এরকম প্রবাহ প্রকৃতিতে দেখা যায়। হ্যান্স আইনস্টাইন সারাদিন নৌকায় কাটিয়েছিলেন এবং কচুরিপানাগুলোর গতিবিধি লক্ষ্য করেছিলেন। কিন্তু মাঝি খুব সহজেই এই সেকেন্ডারি কারেন্টের ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং হ্যান্স আইনস্টাইনের লেখায় তা প্রকাশিত হয়েছিল।
“জল ও জলাধার ভাবনার স্রোতধ্বনি” বইটিতে মোট আঠারোটি অধ্যায় আছে। প্রতিটি অধ্যায় গবেষণার ভিত্তিতে এবং লেখকের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। ‘পানি ও জীবন’ প্রবন্ধে, যেভাবে পানিকে কেন জীবন বলা হয়, কিংবা তার পরের অধ্যায়, সভ্যতার সাথে পানির সম্পর্ক, অতি আকর্ষণীয়ভাবে বর্ণিত হয়েছে।
লেখক জাহিদ হোসেন ফিরোজ বোধকরি সাহিত্য অনুরাগী। নিবন্ধ লেখকের লেখায়, নদীর বর্ণনায় কিংবা নদীর পাড়ে বসবাসকারীদের পূর্ণ জীবন উন্মোচিত হয়েছে। এর পরের প্রবন্ধটি হচ্ছে নদীর রেসপন্স বিষয়ে। সেডিমেন্ট এবং পানির প্রবাহের সাথে মিলে নদীর গতিপথের যে পরিবর্তন হয়, তার যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা আমি চমৎকার বলব। যে ইকুয়েশনের মাধ্যমে এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, এটিকে এবং আরো কিছু ইকুয়েশনের মাধ্যমে নদীর গতি-প্রকৃতি নিয়ে ব্যাখ্যার কাজ যা আছে, তা আমি নিজেও পড়িয়েছি।
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর নাম নিয়ে জনাব ফিরোজের প্রবন্ধগুলো পড়ে আমি আনন্দিত হয়েছি। পানি দূষণ, পানির দুষ্প্রাপ্যতা, সেচের জন্য পানি, ভূগর্ভস্থ পানি ইত্যাদি বিষয়ে তার প্রবন্ধগুলো নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে অনেক পাঠককে ভাবনা-চিন্তার খোরাক দিবে। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সামগ্রিক অ্যাপ্রোচ নিয়ে ছোট প্রবন্ধটিকে আরো গভীরভাবে বিবেচনার অবকাশ রয়েছে।
আমি আশা করব, জনাব জাহিদ হোসেন ফিরোজ পানি আর পানি ব্যবস্থার প্রণয়ন নিয়ে আরো গবেষণা করবেন এবং আগামী প্রজন্মের তরুণদেরকে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবেন।
— ড. আইনুন নিশাত
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
এবং
প্রাক্তন অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।