দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত ঐতিহাসিক নাটক ‘সাজাহান’ (১৯০৯) মূলত মোগল সম্রাট শাহজাহানের জীবনের শেষভাগের ট্র্যাজেডি নিয়ে রচিত। এটি কেবল রাজ্য হারানো এক সম্রাটের কাহিনী নয়, বরং একজন স্নেহশীল পিতা এবং তার সন্তানদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের এক মর্মস্পর্শী আখ্যান।
নাটকটির সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
১. মূল পটভূমি ও সংঘাত
নাটকের শুরু হয় বৃদ্ধ সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে। সম্রাটের চার পুত্র—দারা, সুজা, মুরাদ ও আওরঙ্গজেব—সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। শাহজাহান বড় পুত্র দারাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তাকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিলেন।
২. আওরঙ্গজেবের চাতুর্যনাটকের প্রধান খলনায়ক বা প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হন আওরঙ্গজেব। তিনি অত্যন্ত চতুর, কূটকৌশলী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তিনি প্রথমে মুরাদকে হাত করে দারা ও সুজাকে পরাজিত করেন। পরবর্তীতে নিজের পথ পরিষ্কার করতে মুরাদকেও বন্দি করেন এবং একে একে ভাইদের হত্যা বা নির্বাসিত করে ক্ষমতা দখল করেন।
৩. শাহজাহানের বন্দিত্ব ও হাহাকার
ক্ষমতা দখলের পর আওরঙ্গজেব তার বৃদ্ধ পিতা শাহজাহানকে আগ্রার কেল্লায় বন্দি করেন। এখানে নাটকের মূল ট্র্যাজেডি ফুটে ওঠে। একসময়ের প্রতাপশালী সম্রাট এখন নিঃসঙ্গ বন্দি। তার পাশে কেবল সেবায় নিয়োজিত থাকেন কন্যা জাহানারা। নিজের সন্তানদের এমন নিষ্ঠুরতা এবং প্রিয় পুত্র দারার মৃত্যু সংবাদ শাহজাহানকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
৪. চরিত্রের দ্বন্দ্ব
নাটকটিতে কয়েকটি বিশেষ দিক লক্ষণীয়:
শাহজাহান: একাধারে সম্রাট এবং স্নেহকাতর পিতা। তার চরিত্রের অসহায়ত্ব দর্শকদের সহানুভূতি জাগায়।
আওরঙ্গজেব: কঠিন হৃদয়ের অধিকারী হলেও নাটকের শেষে তার মনেও সূক্ষ্ম অনুশোচনা ও একাকীত্ব দেখা যায়।
দারা: আদর্শবাদী ও উদার চরিত্র, যিনি রাজনীতির মারপ্যাঁচে পরাজিত হন।
৫. সমাপ্তি
নাটকের শেষে দেখা যায়, শাহজাহান পার্থিব সিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজ করছেন। মুঘল সাম্রাজ্যের জাঁকজমকের আড়ালে এক পিতার করুণ আর্তনাদ এবং পারিবারিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে নাটকটি শেষ হয়।
মূল উপজীব্য: "সাজাহান" নাটকটি ক্ষমতার মোহ বনাম পারিবারিক সম্পর্কের চিরন্তন লড়াইয়ের এক অনন্য দলিল। এখানে সম্রাট শাহজাহানের চেয়ে 'পিতা শাহজাহান' অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩) কবি, নাট্যকার, গীতিকার। ১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে তাঁর জন্ম। পিতা সুকণ্ঠ গায়ক কার্তিকেয়চন্দ্র রায় ছিলেন কৃষ্ণনগরের দেওয়ান এবং মাতা প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন অদ্বৈত প্রভুর বংশধর। তাঁর দুই অগ্রজ রাজেন্দ্রলাল ও হরেন্দ্রলাল এবং এক ভ্রাতৃজায়াও সাহিত্যিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।