তত্ত্ব বিস্ফোরণের এই যুগে সাহিত্যের পঠনপাঠনেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। হেলেনিক যুগের প্লেটো ও অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টি এস এলিয়ট পর্যন্ত, অর্থাৎ অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিকস’ থেকে এলিয়টের ‘ট্র্যাডিশন অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়াল ট্যালেন্ট’ পর্যন্ত, সাহিত্য সমালোচনা বলতে মোটা দাগে পাঠ্যবস্তুর প্লট, চরিত্র, লেখকের ভাব-ভাষা-ভাবনা, লেখার বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, পরিপ্রেক্ষিত প্রভৃতির বিশ্লেষণ বোঝাতো। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত আই এ রিচার্ডসের ‘প্র্যাক্টিক্যাল ক্রিটিসিজম’ এই দীর্ঘ-প্রচলিত সাহিত্য সমালোচনা ধারায় এক নতুন শিহরণ জাগায় যা টেক্সট-ঘনিষ্ঠ এক নিরীক্ষাধর্মী পঠন প্রক্রিয়ার সূচনা করে। প্রফেসর রিচার্ডস কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নামবিহীন কবিতা পর্যালোচনা করতে দিতেন যা সমকালীন সাহিত্য তাত্ত্বিকদের মাঝে বিপুল সাড়া জাগায়। বিশ শতকের মাঝামাঝি আমেরিকায় ‘নিউ ক্রিটিসিজম’ নামক যে প্রকরণবাদী সাহিত্য আন্দোলন বিকশিত হয় তাতে অগ্রদূত হিসেবে টি এস এলিয়ট, আই এ রিচার্ডস এবং এফ আর লেভিসের ‘ক্যামব্রিজ ক্রিটিসিজম’ নামে খ্যাত প্রায়োগিক সমালোচনাধারার অপরিসীম প্রভাব রয়েছে। লেখকের অভিপ্রায়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং পাঠক প্রতিক্রিয়ার মতো বাহ্যিক বিষয়কে সচেতনভাবে পরিহার করে বিচ্ছিন্নভাবে ঘনিষ্ঠ পাঠ এবং বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের মাধ্যমে টেক্সট-কেন্দ্রিক অন্তঃস্থ প্রকরণবাদী উপাদানসমূহের (উপমা, রূপক, চিত্রকল্প, কূটাভাস, বক্রাঘাত প্রভৃতি) বিনির্মাণ করাই বস্তুত নয়া সমালোচনার কাজ হয়ে ওঠে। সাহিত্যবস্তুর আত্মনির্ভর এই বিনির্মাণ এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, জাক দেরিদার মতো বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিকও টেক্সট-বহির্ভূত সব কিছুরই অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন (there is nothing outside the text)।
তাই বলে আধুনিকত্তোর কালে পাঠ্যবাদী নয়া সমালোচনার জয়জয়কারের মাঝেও সাহিত্য সমালোচনায় টেক্সট-বহিঃস্থ বিষয় যেমনÑ লেখকের অভিপ্রায়, পাঠক প্রতিক্রিয়া কিংবা ঐতিহাসিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাজেয়াপ্ত হয়নি। কানাডীয় সাহিত্যতাত্ত্বিক নর্থ্রপ ফ্রাই তাঁর আর্কিটাইপাল ক্রিটিসিজমে নয়া সমালোচনার অনুগ্রহপুষ্ট টেক্সটবিশেষের নিবিড় পঠনের মাধ্যমে তার অন্তঃস্থ প্রকরণসমূহ বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া নাকোচ করে কীভাবে সকল সাহিত্য মিলেমিশে একটা ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ সাহিত্যিক মহাবিশ্ব’ (self-contained literary universe) গড়ে তুলতে পারে তা অনুধাবনের অনুকূলে একটা পদ্ধতিগত কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেন। এদিকে রিডার রেসপন্স আর নিউ হিস্টরিসিজম তত্ত্বের উদ্ভবের ফলে টেক্সট-বহির্ভূত বিষয়গুলোর অধ্যয়ন এক নতুন মাত্রিকতা পায়। মোদ্দা কথা, টেক্সট-নির্ভরই হোক আর টেক্সট-বহির্ভূতই হোক, সাহিত্য সমালোচনা-ধারা কালের যাত্রায় রকমারি তত্ত্বের সংস্পর্শে এসে আরও বেগবান হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে আরো সুশৃঙ্খল, পদ্ধতিগত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও একাডেমিক। পোস্টমডার্নিস্ট, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট, পোস্টকলোনিয়াল, ডিকন্সট্রাকশনিস্ট, ফেমিনিস্ট, সাইকোএনালিস্ট, মার্ক্সিস্ট, নিউহিস্টরিসিস্ট প্রভৃতি গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ, উজ্জ্বল, ভাবোদ্রেকী সাহিত্যতত্ত্বের আলো ফেলে তত্ত্বজ্ঞ গবেষকেরা আবিষ্কার করে চলেছেন সাহিত্যবস্তুর অনাগত অর্থ। খুঁজে বের করছেন অর্থের ভেতরের অর্থ। সমৃদ্ধ হচ্ছে সমালোচনার বহমান ধারা।
বাংলা সাহিত্য সমালোচনার ধারা এর অন্যান্য শাখার মতো শক্তিশালী নয়। বাংলা রেনেসাঁসের আলোয় মধুসূদন-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ যে শক্তিশালী সমালোচনা ধারার সূচনা করেছিলেন তা মোটামুটি সাফল্যের সাথেই বয়ে নিয়ে যান শশাঙ্কমোহন সেন, প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদার, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধচন্দ্র সেন গুপ্ত, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখের মতো দাপুটে সমালোচক। পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব বসু, হুমায়ুন আজাদ এমনকি অবাঙালি আবু সয়ীদ আইয়ুবও বাংলা সাহিত্য সমালোচনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
কিন্তু, তত্ত্ব বিস্ফোরণের এই যুগে, গ্রহময় সাহিত্য সমালোচনার ধারা যেভাবে তত্ত্বের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে, সে তুলনায় বাংলা সাহিত্য সমালোচনার বর্তমান রূপ অত্যন্ত অনুজ্জ্বল। প্রচলিত তত্ত্বের আলোকে বাংলা সাহিত্যবস্তুর বিশ্লেষণ হতাশাজনকভাবে অপ্রতুল। একাডেমিয়াতে সাহিত্যের শ্রেণিকক্ষে এবং উচ্চতর গবেষণার ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক কাঠামো সরবরাহের প্রয়োজনে সাহিত্যতত্ত্বের খানিকটা প্রয়োগ হলেও বাংলা সাহিত্য সমালোচনার ধারায় তত্ত্বের ব্যবহার প্রায় দুর্লক্ষ্য।
আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে সাহিত্যতত্ত্ব পড়াই তিন দশকের অধিক সময় ধরে এবং ২০০২ সালে ‘উত্তরাধুনিক সাহিত্য ও সমালোচনা তত্ত্ব’ নামে একটি বইও লিখি। সেই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যতত্ত্ববিদ আমার শিক্ষক প্রফেসর ফকরুল আলম। আমার লেখালিখির প্রধান এলাকা ইংরেজি। তবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অনুরুদ্ধ হয়ে বাংলায় যেসকল প্রবন্ধ লিখেছি, বিশেষত সাহিত্যের ওপরেÑসেগুলোতে প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব কপচানোর চেষ্টা করেছি বিষয়ের গভীরে প্রবেশের জন্য। মনে আছে প্রায় দুই যুগ আগে প্রফেসর সৈয়দ আকরম হোসেন তাঁর ‘উলুখাগড়া’ পত্রিকার জন্য আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও সেলিনা হোসেনের ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’-এর একটি নব্য ইতিহাসবাদী পঠন রচনার জন্য আমাকে কমিশন করেছিলেন। সেসময়ই স্যার বাংলা সাহিত্য সমালোচনা ধারায় তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গুরুত্বের কথা বলেন এবং এ বিষয়ে আমাকে যোগ্য বিবেচনা করে আমার মধ্যে প্রবল উৎসাহের সূচনা করেন।
এই গ্রন্থের অধিকাংশ লেখাই সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে রচিত। তারপরও কিছু লেখা গ্রন্থটির স্বাস্থ্যহানি ঘোচাতে কাজে লাগানো হয়েছে। সেগুলোও আশা করি ভাবনার খোরাক জোগাবে। আধুনিকোত্তর সাহিত্য-পাঠ প্রক্রিয়ার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য যদি নতুন প্রজন্মের সমালোচকেরা তত্ত্বের ছুরিচাকু নিয়ে সাহিত্যের ময়নাতদন্তে নেমে পড়েনÑ যদি নতুন করে মধুসূদন-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুল-জীবনানন্দের সাহিত্যের বুক চিরে, তাদের সৃষ্টিশীলতার রহস্য ভেদ করে, সাহিত্যিক সংকেত অনাবৃত করে নতুন বয়ান রচনা করতে পারেনÑ তাহলে বাংলা সাহিত্য সমালোচনার ধারা বৈশ্বিক মানে উন্নীত হবে।