দীনবন্ধু মিত্রের কালজয়ী নাটক 'নীলদর্পণ' (১৮৬০) বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ঐতিহাসিক সৃষ্টি। এটি মূলত নীল চাষীদের ওপর ইংরেজ নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচার এবং শোষণের করুণ আখ্যান।
নিচে নাটকটির সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
১. পটভূমি
উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ সমাজ। ব্রিটিশ নীলকররা অধিক লাভের আশায় কৃষকদের ধান চাষ বাদ দিয়ে জোরপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করত। এই প্রেক্ষাপটে নদীয়া জেলার একটি কাল্পনিক গ্রাম 'স্বর্ণপুর' এবং সেখানকার এক মধ্যবিত্ত সম্পন্ন কৃষক পরিবারকে কেন্দ্র করে নাটকের কাহিনী আবর্তিত হয়।
২. কাহিনীর মূল ধারা
নাটকটির প্রধান চরিত্র গোলকচন্দ্র বসু একজন নীতিবান কৃষক। তার পরিবার সুখে-শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু নীলকর সাহেব জে. জে. উড এবং তার সহকারী পি. পি. রোজ তাদের ওপর নজর দেয়। তারা চায় গোলক বসুর উর্বর জমিতে নীল চাষ করাতে।
অত্যাচার ও প্রতিরোধ: গোলক বসুর বড় ছেলে নবীনমাধব নীলকরদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সে আইনের আশ্রয় নিয়ে লড়াই করার চেষ্টা করে। কিন্তু নীলকরদের হাতে আইন ও প্রশাসন—উভয়ই বন্দি ছিল।
পারিবারিক ধ্বংস: নীলকরদের ষড়যন্ত্রে গোলক বসু মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলে যান এবং অপমানে আত্মহত্যা করেন। নবীনমাধব নীলকরদের পিটুনিতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মারা যায়।
নারীর লাঞ্ছনা: গোলক বসুর ছোট ছেলে বিন্দুমাধবের স্ত্রী সরলতা নীলকর সাহেবদের লালসার শিকার হন। এই লজ্জা ও অপমানে শেষ পর্যন্ত তাদের পরিবারটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। নবীনমাধবের মা সাবিত্রী শোকে উন্মাদ হয়ে যান এবং পরে মারা যান।
৩. তোরাপ ও রাইচরণ
নাটকে তোরাপ চরিত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে একজন সাধারণ কৃষক যে শারীরিক ও মানসিকভাবে নীলকরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তার সাহসিকতা এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তৎকালীন সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নাটকের গুরুত্ব ও প্রভাব
সামাজিক চেতনা: এই নাটকটি নীল চাষীদের দুর্দশা ব্রিটিশ সরকারের নজরে আনতে সাহায্য করেছিল।
নীল বিদ্রোহ: নাটকটি প্রকাশের পর বাঙালির মধ্যে ব্যাপক দেশপ্রেম ও বিদ্রোহী চেতনার সঞ্চার হয়, যা পরে 'নীল বিদ্রোহ'-কে আরও বেগবান করে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রেভারেন্ড জেমস লং: নাটকটি ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং প্রকাশ করেছিলেন জেমস লং। এই অপরাধে ইংরেজরা জেমস লং-এর জেল ও জরিমানা করেছিল।
উপসংহার: 'নীলদর্পণ' কেবল একটি নাটক নয়, এটি ছিল নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণার একটি দলিল। দীনবন্ধু মিত্র কৃষকদের চোখের জলকে কালিতে রূপান্তর করে নীলকরদের আসল চেহারা সমাজের সামনে উন্মোচিত করেছিলেন।