উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর 'ছোটদের রামায়ণ' বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে একটি কালজয়ী ধ্রুপদী সৃষ্টি। মহাকবি বাল্মীকির মূল রামায়ণ অত্যন্ত বিশাল এবং জটিল, কিন্তু উপেন্দ্রকিশোর তাঁর অসাধারণ লেখনী শৈলীর মাধ্যমে সেই মহাকাব্যকে ছোটদের উপযোগী করে সহজ ও প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপন করেছেন।
বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনা
এই বইটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সহজবোধ্য ভাষা। লেখক মূল রামায়ণের মূল আখ্যানভাগকে অক্ষুণ্ণ রেখে অপ্রাসঙ্গিক বা জটিল অংশগুলো বর্জন করেছেন। ফলে রাম-সীতার বনবাস, রাবণ বধ এবং হনুমানের বীরত্বগাথা শিশুদের কাছে গল্পের মতো মনে হয়। উপেন্দ্রকিশোরের ভাষার জাদু এমন যে, গম্ভীর কোনো দৃশ্যও অত্যন্ত মনোরম হয়ে ওঠে।
শৈল্পিক অলংকরণ
'ছোটদের রামায়ণ'-এর আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এর অলংকরণ। উপেন্দ্রকিশোর নিজেই একজন সুদক্ষ চিত্রশিল্পী ছিলেন। বইটিতে ব্যবহৃত কাঠখোদাই এবং হাফটোন ব্লকের ছবিগুলো কাহিনীকে শিশুদের চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে। তাঁর আঁকা দশানন রাবণ কিংবা বীর হনুমানের ছবি আজও পাঠকদের মনে গেঁথে আছে।
নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ
কেবল একটি কাহিনী হিসেবে নয়, উপেন্দ্রকিশোর এই বইটির মাধ্যমে শিশুদের মনে নৈতিক বোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সত্যনিষ্ঠা, পিতৃভক্তি, ভ্রাতৃত্ব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয়ের যে শাশ্বত বার্তা রামায়ণে রয়েছে, তা তিনি অত্যন্ত সহজভাবে তুলে ধরেছেন। এতে শিশুরা যেমন আনন্দের সাথে গল্প পড়ে, তেমনি জীবনের কিছু মৌলিক আদর্শ সম্পর্কেও ধারণা পায়।
গুরুত্ব
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রকাশিত এই বইটি আজও তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। আধুনিক যুগে যখন শিশুরা নানা বিনোদনের মাধ্যমে মহাকাব্যিক চরিত্রগুলোর সাথে পরিচিত হচ্ছে, তখন উপেন্দ্রকিশোরের 'ছোটদের রামায়ণ' আজও তাদের কল্পনাশক্তি বিকাশে এবং বিশুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চায় শ্রেষ্ঠ পাথেয় হিসেবে গণ্য হয়।
পরিশেষে বলা যায়, এটি কেবল একটি ছোটদের বই নয়, বরং এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পাঠকদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।
উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৭শে বৈশাখ (১৮৬৩ সালের ১০ই মে) ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া গ্রামে, যা অধুনা বাংলাদেশে অবস্থিত। তাঁর পিতা কালিনাথ রায় ছিলেন সুদর্শন ও আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃতে সুপণ্ডিত। তাঁর ডাকনাম ছিল শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দরের আটটি সন্তানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসন্তান। তাঁর পৈতৃক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে তাঁর পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাঁকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। মেধাবী ছাত্র বলে পড়াশোনায় ভাল ফল করলেও ছোটোবেলা থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের পড়াশোনার থেকে বেশি অনুরাগ ছিল বাঁশী, বেহালা ও সঙ্গীতের প্রতি। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে উপেন্দ্রকিশোর প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। তারপর কলকাতায় এসে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে। ১৯১৫ সালের ২০শে ডিসেম্বর মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে উপেন্দ্রকিশোর পরলোক গমন করেন।