তাবেদার রসুল বকুল একজন স্বভাবকবি। তাঁর কাব্যচেতনায় প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, মানবিকতা, স্মৃতিকাতরতা, বিরহবোধ প্রগাঢ়ভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর ২২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বক্ষমান কাব্যগ্রন্থে কবির নিজস্ব চিন্তাসৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তাঁর কবিতার ভাষা একেবারে সহজবোধ্য, পরিশীলিত এবং প্রাঞ্জল। তাবেদার রসুল বকুল প্রেমাসক্ত কবি। কিন্তু তাঁর চিন্তাচেতনা ন্যায়বোধে পরিশিষ্ট। এজন্য কবির নৈতিক প্রেম-ভালোবাসা-প্রীতির এক ব্যঞ্জনা ঘটেছে কবিতায়। তিনি ‘দাঁড়িপাল্লা’ কবিতায় লিখেন—
‘বিশ্বাস করো আর নাই করো / আমি তোমায় ভালোবাসি / শতভাগ সত্য। / সন্দেহ থাকলে / ওজন দিতে পারো / দাঁড়িপাল্লায়।’
বকুলের কবিতায় মূল্যবোধের প্রাগ্রসরতা বিদ্যমান। এজন্য তাঁর কবিতায় নৈতিক মানদণ্ডের বার্তা বহন করে। মনুষ্যজীবনের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বৈশিষ্ট্য হলে অহংকার। কবি প্রেমিকার মনের অহংকারকে তুলে ধরতে ‘অহংকার’ কবিতায় বলেন—
ভালোবাসা অহংকার ও গর্জন দিয়ে হয় না। ‘ভালোবাসতে মন লাগে মন / যেটা তোমার ছিল না।’
কবি তাবেদার রসুল বকুল নস্টালজিক ভাবনায় নিমজ্জমান একজন চিন্তক। তাঁর অতীত স্মৃতি এবং ভালোবাসা তাঁকে স্মৃতিকাতর করে তুলে। উপমা, চিত্রকল্প, অনুপ্রাস এবং ঝংকারের মাধুর্যতায় তিনি তুলে ধরেন তাঁর অতীত স্মৃতি। তিনি বর্তমানে বাস করলেও অতীতকে খোঁজে বেড়ান। তিনি ‘আমার স্মৃতি আমার অতীত’ নামক গদ্য কবিতায় চিত্রকল্পের আবহে বলেন—
উঁচুনিচু টিলা, কোথাও বা সমতল আর বেশ ক’টা গলি, একটা মেইন সড়ক দিয়ে আমাদের এলাকা—মিরবক্সটুলা। টিনশেডের আধাপাকা একচালা, দুচালা আসাম টাইপের ঘর দিয়ে সাজানো আমাদের পাড়া। কারো ঘরের সামনে সামান্য ফুলের বাগান, কারো সামনে ফাঁকা। টিনের চালে টপটপ করে বৃষ্টির পানি পড়ে উঠান ভিজে যায়।
বকুল যেমন নারী দেহের অঙ্গকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তেমনই তিনি ফিরে গেছেন অতীতের প্রিয় একটি মাধ্যমে। একটি সময় প্রচুর চিঠিপত্রের প্রচলন ঘটেছে। অবশ্য কবির ‘পত্রপ্রাপক বকুল’ নামক একটি চিঠিপত্রের সন্নিবেশবিশিষ্ট গ্রন্থ। সেইজন্য চিঠির আবেগ-অনুভূতি-অনুষঙ্গকে তিনি রোমান্টিকতায় রূপ দিয়েছেন। তিনি ‘চিঠির আশায়’ কবিতায় লিখেন—
‘হাতের স্মার্টফোনে টিপ দিলেই চলে আসে দিনের সব খবর / আসে তোমার মনের খবর / আগের মতো আবেগ নেই, চিঠির সেই জাদুও নেই। / আমি বুড়ো হলাম / আগের মতোই রয়ে গেলাম / একটা বড় চিঠির আশায়।’
তাবেদার রসুল বকুল - একজন নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ কবি-গবেষকসংগঠক। বকুলের পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার গুনিয়াউক গ্রামে। বকুলের জন্য সিলেটে। পড়াশােনা করেছেন সিলেট ও কুমিল্লায়। বাংলা একাডেমীর সদস্য, দেশের অন্যতম প্রাচীন সাহিত্য প্রতিষ্ঠান সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম। সাহিত্য সংসদের পৃষ্ঠপােষক সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত। ব্যক্তিগত ভ্রমণ এবং গবেষণার খাতিরে বিভিন্ন সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন। তাঁর জীবনের স্মরণীয় । মুহূর্তগুলাে হচ্ছে ব্রিটিশ লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, মিডল টেম্পেলসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন আর্কাইভ, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব ইন্ডিয়া-য় গবেষণার জন্য দিনের পর দিন অবস্থান। এ পর্যন্ত তাঁর কবিতা, গল্প ও । গবেষণামূলক এগারটি বই বেরিয়েছে। ব্যারিষ্টার আব্দুল রসুল: জীবন ও কর্ম গ্রন্থটি তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমী গবেষণার ফসল।