ছড়া সাহিত্যের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম বা শাখা। এ মাধ্যমটি সহজেই সব শ্রেণীর পাঠককে আনন্দ দিতে পারে, পাঠকের চিন্তা শক্তির উন্মেষ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষণে-বিনোদনে ছড়া অতুলনীয়-ছড়াবিহীন শৈশবকাল অচিন্তনীয় ব্যাপার। সহজ সরল ভাষায় ছন্দ-অন্ত্যমিলের দোলায় ছড়া সহজেই শিশুদের হৃদয় জয় করতে পারে। আবার ছড়া সত্য প্রকাশে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মত প্রকাশে, রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি-সংস্কৃতির উত্থান-পতন সাবলীল প্রকাশে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মত সমান পারঙ্গম। কোন বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে জনমত সংগঠনেও ছড়ার ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। হাস্য-ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে কঠিন বিষয়কে সহজ আর প্রাণবন্ত করে বলার নৈপুণ্যে ছড়ার ভূমিকার জুড়ি মেলা ভার।
বাংলা সাহিত্য ভান্ডারকে ঋদ্ধ করতে ছড়ার অবদান অনস্বীকার্য। কারো কারো মতে বাংলা ছড়ার উৎপত্তি হাজার-দেড়হাজার বছর আগে, অর্থাৎ চর্যাকারদের হাতে। অনেকের দ্বিমতও আছে। তবে সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে-ছড়া শুরুতে মৌখিকভাবে রচিত হত, ছড়াই সাহিত্যের আদি শাখা এবং ছড়াই বাংলা সাহিত্যের প্রথম লিখিতরূপ। অনেক দেরিতে, সম্ভবত ১৮৯৯ সালে প্রবাদপ্রতিম ছড়াকার যোগীন্দ্রনাথ সরকার মৌখিক তথা লৌকিক ছড়াগুলো সংগ্রহ করে লিখিতরূপ দেন এবং 'খুকুমণির ছড়া' নামে প্রকাশিত এ গ্রন্থের ভূমিকায় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রথমবারের মতো ছড়াকে সাহিত্যের শাখা বলে উল্লেখ করেন। বর্তমানে উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, কবিতার মতো বাংলা সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ শাখা হচ্ছে ছড়া। বিষয় বৈচিত্র্যে, সৌকর্যে, ছন্দ-অন্ত্যমিলের শক্তিমত্তায় ছড়া ব্যাপক জনগণের হৃদয় জয় করে চলেছে। শিশুতোষ ঘুমপাড়ানি ছড়ার পাশাপাশি রচিত হচ্ছে সমাজবিকাশমূলক ঘুমজাগানিয়া ছড়া। ছড়া আপন শক্তিতে বাংলা সাহিত্যে একটা বিশেষ স্থান দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে। ছড়াতে অতীত-বর্তমানের জাতীয় চাল-চিত্রসহ আগামী দিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনা ফুটে ওঠে। বর্তমানে লেখক মাত্রই ছড়া লেখার অন্তর তাগিদ অনুভব করেন। ছড়া বাংলা সাহিত্যের নির্ভেজাল মৌলিক নিজস্ব ভাবসম্পদ।
বাংলা সাহিত্যের এ মৌলিক বিষয়টির বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে ছড়াকে চির নবীন 'শিশু' ও পরিবর্তনশীল 'মেঘ' এর সাথে তুলনা করে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন-'এই সকল ছড়ার মধ্যে একটি চিরত্ব আছে। কোনোটির কোনো কালে কোনো রচিয়তা ছিল বলিয়া পরিচয় মাত্র নাই এবং কোন্ শকের কোন্ তারিখে কোন্টা রচিত হইয়াছিল, এমন প্রশ্নও কাহারও মনে উদয় হয় না। এই স্বাভাবিক চিরত্ব গুণে ইহারা আজ রচিত হইলেও পুরাতন এবং সহস্র বৎসর পূর্বে রচিত হইলে নূতন'। এ ছাড়া রচনার বিষয়-কৌশল সম্পর্কে প্রাতঃস্মরণীয় ছড়াকার অন্নদাশঙ্কর রায় বলেন 'ছড়া লেখার উপকরণ আসে সমসাময়িক ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকে....।... কবিতার মত ছড়ার নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, ছড়া বানাবার, ছড়া হয় আকস্মিক, ইরেগুল্যার। সেখানে আর্ট আছে, আর্টিফিসিয়ালিটি'র স্থান নেই।'