একবিংশ শতাব্দীর ইসলামী আন্দোলন পরিবর্তিত নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। ফলে তার মৌলিকত্ব ধরে রেখে উপযোগী বাস্তবতার আলোকে পথ চলার যোগ্য হয়ে ওঠার গুরুত্ব বেড়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যবস্থার গতিপথ প্রতিনিয়ত রূপান্তর হচ্ছে। ইন্টারনেটের অবাধ প্রাপ্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌরাত্ম্যে পরিস্থিতি হয়ে পড়েছে অস্বাভাবিক গতিশীল। অপরদিকে অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্রের ঝনঝনানিতে কেঁপে চলেছে বিশ্ব। এরমাঝেও থেমে নেই জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের ইসলামী আন্দোলন তার ঐতিহ্য ধরে রেখে নানারকম প্রতিকূলতার মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয় বরং এই ভূখণ্ডের চড়াই-উতরাই ত্যাগ কুরবানীর সিলসিলা বিপুল ও প্রবহমান। দীর্ঘ পরিক্রমায় সাফল্যও কম নয়। তবে যথাযথ পরিকল্পনা যোগ্যতার অভাবে বাতিলের মোকাবেলায় আমরা যে পিছিয়েও পড়েছি, এ কথাও স্বীকার করতে হয়।
লেখক জিয়াউল হক একজন বিদগ্ধ মানুষ। তিনি বাংলাদেশ ও বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনগুলো সরাসরি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও জানাশোনার আলোকে এ বিষয়ে কলম ধরেছেন “একুশ শতকের ইসলামী আন্দোলন” নামে। আলোচ্য বইটিতে ইসলামী আন্দোলনের পরিচয়। এই আন্দোলনের পথে বাধাবিপত্তি, সাফল্য ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি আলোকপাত করেছেন আন্দোলনের কাজে নিবেদিত একজন দাঈ ইলাল্লাহর গুণাবলী ও সতর্কতা, যোগ্য হয়ে ওঠার বিষয়ে। বিশেষভাবে বর্তমান বাস্তবতায় কালচারাল, মিডিয়া ও থিংক ট্যাংক উইং শক্তিশালী করার বিষয়ে জোর দিয়েছেন।
ইসলাম ও কমিউনিজম বই সম্পর্কে:
গত শতাব্দীর শুরুতেই তাবৎ দুনিয়ায় আছড়ে পড়ে কমিউনিজমের অবিনাশী ঢেউ। এ ঢেউয়ের প্রলয়ে ভাঙাগড়ার প্রবল খেলায় বদলে যায় মতাদর্শিক বিন্যাসের সাথেসাথে চিন্তা ও আদর্শের ভূগোল। এমন কি ভূখণ্ডের ভূগোলও বদলে যায়। পর হয়ে যায় আপন, রক্তের বন্ধন হয়ে যায় পর। য়ুরোপ আমেরিকায় ধ্বংস ও সাফল্যের উৎসবের মাঝেই চীনে রক্তের মহাসাগরের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় কমিউনিজম। নানা বিবর্তনের পরেও যা এখনও বহাল আছে। রাশিয়া থেকে বিদায় হলেও অধিকৃত মুসলিম দেশগুলো এর হিসাব চুকাতে গিয়ে কুরবানী দেয় লাখ লাখ উম্মতে মুহম্মদীকে। পাশাপাশি কথিত সাম্যবাদের নামে ইসলামের সুমহান আদর্শ থেকে দূরে সরে যায় নেতৃত্ব, রাষ্ট্র ও সমাজ। পুঁজিবাদকে আপন করে নিলেও ইসলামী আদর্শ থেকে এখনও তারা বহুদূরেই আছে।
আরব আজম ও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম তারুণ্যকেও বিপুলভাবে প্রভাবিত করে কমিউনিজম। ইসলামী আদর্শের বিপরীতে মুসলমানের সন্তানরাই হয়ে দাঁড়ায় সমাজতন্ত্রের মুখপাত্র। কেউ হয়ে যায় সরাসরি মুখোমুখি। কেউবা ইসলামের সাথে কমিউনিজমকে গুলিয়ে ফেলে একেই ইসলামের আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি ছড়াতে থাকে। এই সংকট এখনও কাটেনি। বরং সময়ের সাথে নানামুখী রুপান্তরে প্রভাবিত করছে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সবখানেই।
গোলাম মোস্তফা ছিলেন এ ভূখণ্ডের মুসলিম জাতিসত্তার মহান দিশারি চিন্তক। কবি হিসেবে তিনি কবিতা ও সীরাত চর্চার শিখরে অবস্থান করলেও তত্ত্ব দর্শনের খণ্ডনে ছিলেন অনন্য। এ পর্যায়ে তিনি কলম ধরেন কমিউনিজমের মুখ ও মুখোশের বয়ান উন্মোচনের কাজে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে তিনি লেখেন “ইসলাম ও কমিউনিজম” গ্রন্থটি। বইটি প্রকাশের পরপরই সাড়া পরে যায়। পক্ষে বিপক্ষে বিপুল তর্কবিতর্ক চলতেই থাকে। যা আজও বিদ্যামান।
আলোচ্য বইটিতে লেখক ইসলাম ও কমিউনিজমের মতাদর্শিক পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি এর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। ইসলামের সাথে কমিউনিজমের বেশকিছু পর্যায়ে মিল থাকলেও মতাদর্শিক প্রেক্ষাপটে কমিউনিজম ও ইসলাম; দুটি যে আলাদা বিষয় তা লেখক সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন।
এই বইয়ের আবেদন এখন বিদ্যামান। কমিউনিজমের ঘুলঘুলিতে আজও বাঙালী মুসলিম তারুণ্য দিশেহারা। তাই, ইসলাম ও কমিউনিজমের তুলনামূলক আলোচনার উপর গোলাম মোস্তফা রচিত “ইসলাম ও কমিউনিজম” বইটি তালবিয়া প্রকাশন নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা আশাকরি বইটির নব প্রকাশ পাঠকদের ঋদ্ধ করবে।
কৃষ্টি আর কুষ্টি’র (পাট) জন্য বিখ্যাত কুষ্টিয়ার সন্তান জিয়াউল হক। জন্ম ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৬০। তৎকালীন পাকিস্থান নৌবাহিনীতে কর্মরত পিতার কর্মস্থল করাচিতেই কেটেছে শৈশব-কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলো। ১৯৭৪-এ বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুরের ফিলিপনগর প্রত্যাবর্তন। মেন্টাল হেলথ্ নার্সিং, মেন্টাল হেলথ, সাইকিয়াট্রিক রিহাবিলিটেশন-এ পড়াশোনা করেছেন তিনি। সর্বশেষ ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটি থেকে মেন্টাল হেলথ, ইএমআই ও ডিমেনশিয়া ম্যানেজমেন্ট কোর্স শেষ করে ইংল্যান্ডেরই একটি বেসরকারি মেন্টাল হাসপাতালের ডেপুটি ম্যানেজার ও ক্লিনিকাল লিড হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখন লেখালিখিতেই ব্যস্ত। নাবিকের নোঙ্গর হয় ঘাটে ঘাটে। শৈশবেই খেলাচ্ছলে কলম হাতে নিয়ে লিখতে বসা, একজন নাবিক পিতার সন্তান জনাব জিয়াউল হকও জীবনের তিন-চতুর্থাংশ সময়ই দেশের বাইরে কাটিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পেরিয়ে চাকরির সুবাদে ইংল্যান্ডে স্থায়ীভাবে অবস্থান করলেও নিয়মিত লেখালেখি করছেন। এ পর্যন্ত তাঁর তিরিশটি গ্রন্থ ও গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে ‘বই খাতা কলম’, ‘মানব সম্পদ উন্নয়নে আল কুরআন’, ‘ব্রিটেনে মুসলিম শাসক’, ‘বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা’, ‘ইসলাম : সভ্যতার শেষ ঠিকানা’, ‘ইসলামি শাসন ব্যবস্থা : মৌলিক দর্শন ও শর্তাবলি’, ‘ধরণীর পথে পথে’, ‘অন্তর মম বিকশিত করো’, ‘একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ ও যুব মানস’, ‘তেইশ : দ্য টাইম টু রাইজ আপ’, ‘মন ও মানসিক স্বাস্থ্য’ ও ‘মুসলমান : এ নেশন অব দ্য বুক, আলোর ফেরিওয়ালা’ এগুলো অন্যতম। ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সমসাময়িক বিষয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিন শতাধিক ফিচার, প্রবন্ধ ও কলাম লিখেছেন। লন্ডন ভিত্তিক বাংলা-ইংরেজি দ্বি-ভাষিক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ইউরোবাংলা’র তিনি একজন নিয়মিত কলামিষ্ট ছিলেন।