অ্যাডলফ হিটলার—যার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা আর কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বীভৎসতা। কিন্তু এই দানবীয় সত্তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই রক্ত-মাংসের মানুষটিকে আমরা কতটা চিনি? দেওয়ান মেহেদী অজেয়-এর এই গ্রন্থটি নিছক কোনো ইতিহাসের কঙ্কাল নয়, বরং এক ছন্নছাড়া যুবকের বিশ্বজয়ের নেশায় মত্ত হওয়ার এক জীবন্ত আখ্যান।
বইটির শুরু হয় লিন্জের এক অশান্ত বালককে দিয়ে, যে বাবার কঠোর শাসনে পিষ্ট হয়েও মায়ের আঁচলের ছায়ায় খুঁজে পেত পরম মমতা। শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভিয়েনার রাজপথে ঘুরে বেড়ানো সেই ব্যর্থ যুবকটি কীভাবে ক্ষুধার জ্বালা আর একাকীত্বের বিষাদকে চরম প্রতিহিংসায় রূপান্তর করল, লেখক তা অত্যন্ত দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। মায়ের মৃত্যুতে হিটলারের সেই বুকফাটা হাহাকার কিংবা ভিয়েনার লজিং হাউসে বসে রাজনীতি নিয়ে তাঁর সেই ‘উদভট’ সব তর্কের স্মৃতি পাঠকদের নিয়ে যাবে এক শতাব্দী আগের সেই উত্তাল দিনগুলোতে।
বইটি আমাদের দেখায়, কীভাবে মিউনিখের এক অন্ধকার বিয়ার হল থেকে এক সাধারণ ‘বাঁশিওয়ালা’ তার জাদুকরী বক্তৃতায় পুরো জার্মানিকে সম্মোহিত করে ফেলল। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে চ্যান্সেলরের গদিতে বসা থেকে শুরু করে নিজেকে ‘ফুয়েরার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সেই অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দখলের লড়াই এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ক্ষমতার চরম শিখরে পৌঁছে কীভাবে হিটলার একে একে তার সহযোগীদের সরিয়ে দিলেন, কীভাবে শুরু করলেন ইতিহাসের নিকৃষ্টতম গণহত্যা, আর শেষ পর্যন্ত বার্লিনের সেই নির্জন বাঙ্কারে বিষণ্ন মনে কীভাবে এক প্রবল প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের পতন হলো—তার প্রতিটি মুহূর্ত এখানে উঠে এসেছে সিনেমার মতো।
আটাশটি তথ্যসমৃদ্ধ অধ্যায় এবং একশটি দুর্লভ ছবির সমন্বয়ে রচিত এই বইটি কেবল ইতিহাসের পাঠক নয়, বরং মানুষের বিচিত্র মনস্তত্ত্ব বুঝতে চাওয়া যে কোনো পাঠকের জন্য এক অনন্য দলিল। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যে একাই পাল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর মানচিত্র, আর শেষ পর্যন্ত অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছিল এক ভয়াবহ শিক্ষা।