বইটি কেন, কীভাবে
সমাজের ক্রমাগত বিবর্তন, সভ্যতার উত্থান-পতন, নতুন কিছু নির্মাণ, আবিষ্কার, উদ্ভাবন, সমাজ-পরিবেশ-প্রতিবেশের বৈপ্লবিক রূপবদল, শিক্ষা, সমাজ-সংস্কৃতির যে আমূল পরিবর্তন সবখানে রয়েছে তারুণ্যের সুস্পষ্ট প্রভাব। যদিও এই পরিবর্তন এতটা বেগবান যে, মানবসমাজের এর সঙ্গে পেরে ওঠাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ শতকের শেষের মধ্যদিয়ে সূচনা একুশ শতকের। ২০০১ সাল থেকে এই শতকের শুরু ধরা হয়। আর শেষ হবে ২১০০ সালের মধ্যদিয়ে। তারও বহু আগে, বাষ্পীয় ইঞ্জিন উদ্ভাবনের মাধ্যমে শুরু হয় প্রথম শিল্পবিপ্লব। বিদ্যুতের আবিষ্কারে আসে দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব। পৃথিবী তখন নতুন ছন্দ পায়, বাল্বের আলোয় হয়ে উঠে আলোকিত। এরপর আসে তৃতীয় শিল্পবিপ্লব, যা দিয়েছে কম্পিউটার-ইন্টারনেট এর মতো বিস্ময়কর আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের ফলে নতুন যে বিপ্লব শুরু হয় সে বিপ্লবের চূড়ান্ত পরিণতি হয়ে আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংকস, বায়োটেকনোলজির সঙ্গে অটোমেশন প্রযুক্তির মিশেল, ক্যাশলেস পৃথিবী, ড্রাইভারলেস পরিবহন সহ আরও বহু বৈপ্লবিক উদ্ভাবন। সবে বলা যায় একুশ শতকের শুরুর সময়। মাত্র এই ২৪ বছরে পৃথিবীর যে বৈপ্লবিক রূপ বদল, তাকে বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। একুশ শতক শেষ হতে এখনো বাকি আরও ৭৫ বছর। এই শতক যেভাবে ম্যাজিক দেখিয়ে চলেছে, তাতে করে কল্পনা করাও কঠিন যে, আগামীর দিনগুলো মানব সভ্যতার জন্য কেমন হতে চলেছে! একুশ শতকের তরুণরা পরিবর্তিত বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত? যেমন—
• তাদের দক্ষতা, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা কি দেশ উন্নয়নের জন্য কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে?
• প্রযুক্তি, পরিবেশ ও বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে তাদের অভিযোজন কতটা মানসম্মত?
তরুণরা তাদের সুনিপুণ নেতৃত্ব ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা বা অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সমাজ ও দেশের জন্য কীভাবে কর্মপন্থা নির্ধারণ করছে বা করতে পারে, বিশেষত; কোন কোন ক্ষেত্রে কর্মোদ্যোগের মাধ্যমে দেশ পুর্নগঠনে অবদান রাখছে:
তরুণদের শক্তি ও সম্ভাবনা, তরুণ নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন: ভবিষ্যতের জন্য নতুন শিক্ষাচিন্তা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন. প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রজন্ম, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও পরিবেশগত উদ্যোগ, সামাজিক ন্যায় ও অন্তর্ভুক্তি, শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল প্রকাশ, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, গ্লোবাল নাগরিকত্ব ও আন্তর্জাতিক সংহতি, স্বেচ্ছাসেবা, কমিউনিটি বিল্ডিং ও স্থানীয় পরিবর্তন, প্রান্তিক কণ্ঠ: গ্রামীণ, আদিবাসী ও বঞ্চিত তরুণ সমাজ, নীতিগত প্রচারণা ও তরুণ নেতৃত্বে সংস্কার, উন্নয়নের জন্য তরুণদের অঙ্গীকারপত্র—প্রভৃতি বিষয় নিয়ে সম্পাদিত হয়েছে একুশ শতকে তারুণ্য: দেশ উন্নয়নে কর্মপন্থা এবং পদক্ষেপ গ্রন্থটি। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা গ্লোবাল সেন্টার পর ইনোভেশন অ্যান্ড লার্নিং (জিসিএফআইএল) এবং বাংলাদেশ গবেষণা সংসদের এর একটি যৌথ উদ্যোগ। এই সিরিজেরই প্রথম একুশ শতকে তারুণ্য ও নেতৃত্ব এবং দ্বিতীয় একুশ শতকে তারুণ্যের দক্ষতা একুশ শতকে তারুণ্যের উদ্যোগ, একুশ শতকে তারুণ্য: জলবায়ু সংকট ও মোকাবিলা-প্রভৃতি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল যথাক্রমে ২০২১ ও ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বইমেলায়। যা ছিল মূলত তরুণ লেখকদেরই লেখনি দিয়ে। তারই ধারাবাহিকতায় এবারও অবতারণা করা হয়েছে পঞ্চম গ্রন্থটি। বইটি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে তরুণ লেখকদের নিয়ে দল গঠন, বিষয় নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহ, সাহিত্য পর্যালোচনা, খসড়া লেখা, পুনঃসম্পাদনা ও চূড়ান্ত সম্পাদনার মাধ্যমে একটি গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
এই সিরিজ প্রকাশের মূল লক্ষ্যই হলো, তরুণদের মাঝে গবেষণা মনোভাব ও লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের লেখা প্রকাশের মাধ্যমে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশে সৃজনশীলতা বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে সাহস সঞ্চার করা। সেই সঙ্গে দলগত কাজ, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, দক্ষতা প্রভৃতির বিকাশও এই বই প্রকাশের উদ্দেশ্য। সীমাবদ্ধতা, ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয় বইটি। যদিও প্রত্যেকের লেখনিতে রয়েছে অফুরান আন্তরিকতা, প্রত্যেকে ছিলেন প্রতিশ্রুতিশীল। প্রত্যেকে চেয়েছেন একুশ শতকের তরুণদের নানাবিধ উদ্যোগ সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরতে।
একুশ শতকে তারুণ্য: দেশ উন্নয়ন কর্মপন্থা ও পদক্ষেপ গ্রন্থটি আমরা উৎসর্গ করেছি ‘বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সকল শহিদ, নেতৃত্ব ও দেশ পুনর্গঠনে অবদান রাখা তরুণদের’। গ্রন্থটি প্রকাশে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন প্রত্যেকের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা এবং সম্মান।
আগামীর বাংলাদেশ গঠনে যাঁরা এগিয়ে আসবেন, তাঁদের পথচলায় এই গ্রন্থ যদি সামান্য অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা দিতে পারে তবেই আমাদের শ্রম সার্থক হবে।
সম্পাদকমণ্ডলী
ঢাকা,জানুয়ারি ২০২৬