সাক্ষাতে যে কথা হয়নি বলা
নোয়াখালীর যে প্রত্যন্ত গ্রামে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা সেখানে সাহিত্যের কোনো অস্তিত্ব আজও নেই। সেই গ্রামে বসেও বইয়ের সংস্পর্শে আসা যার মাধ্যমে তিনি আমার বাবা। এক সময় নিজেরও আগ্রহ তৈরি হলো পড়ার ব্যাপারে। খুব একটা বই পাওয়া যেত না নোয়াখালীতে। বাবা কোনো কাজে ঢাকায় গেলে বিরাট এক তালিকা সঙ্গে পাঠাতাম। তারপর নিজেরই যাওয়া-আসা শুরু। ছাত্রাবস্থায় সারা মাস টাকা জমাতাম আর মাসের শেষে একবার ঢাকা। মূল উদ্দেশ্য বই কেনা। কিনে ফেলে রাখার কোনো ব্যাপার ছিল না। সব বই-ই পড়তাম। সংগ্রহের অধিকাংশ বই-ই আমার একাধিকবার পড়া। পড়তে পড়তে অনেক প্রশ্ন তৈরি হতো মনে। বই সম্পর্কে, বইয়ের লেখক সম্পর্কে। কীভাবে সৃষ্টি হয় একের পর এক উপন্যাস, গল্প, কবিতা! স্রষ্টাদের মনের অবস্থা কী হয় তখন? পরিকল্পনা ছিল, যদি কখনো মুখোমুখি হতে পারি লেখকদের- প্রশ্ন করে সব জেনে নেব।
২০১৮ সালে অসুস্থ হয়ে কলকাতায় গেলাম। দীর্ঘদিন থাকতে হলো চিকিৎসার জন্য। সেই সময়টায় বই পড়া আর পাঠপ্রতিক্রিয়া ধরনের লেখা ছাড়া আর তেমন কোনো কাজ নেই। বাংলাদেশের প্রকাশক হ্ুমায়ূন কবীর ঢালী গিয়েছিলেন সেই সময় কলকাতায়। দেখা করলাম গিয়ে। তাঁকে জানালাম, লেখকদের সাথে দেখা করার বাসনার কথা। তিনি উপায় বললেন। সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যাপারেও খুব উৎসাহ দিলেন। তাঁর সাক্ষাৎকার দিয়েই সাক্ষাতে যত কথার পথচলা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই প্রথম খণ্ডে শুধু ভারতীয় লেখকদের সাক্ষাৎকার থাকছে বলে ঢালী ভাইয়ের সাক্ষাৎকার এখানে নেই।
হুমায়ূন কবীর ঢালী ভাইয়ের কাছ থেকে নেওয়া শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের নম্বরে ফোন করেছিলাম ভয়ে ভয়ে। নিশ্চিত ছিলাম তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হবেন না। ফোন ধরেন কিনা সেটা নিয়েই সন্দিহান ছিলাম। মনে আছে, কুয়াশাচ্ছন্ন এক শীতের সকালে ফোন করেছিলাম অদ্ভুতুড়ে সিরিজের লেখককে। উদ্দেশ্য জানালাম। তিনি সব শুনে বললেন তিনদিন পর যোগাযোগ করতে। আমি এক ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেলাম! সত্যি কি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে সরাসরি দেখতে পাব! তিনদিন পর ফোন করতেই তিনি বললেন পরদিন সকালে চলে যেতে। ঠিকানা দিলেন। কলকাতার রাস্তাঘাট ভালোভাবে না চেনা আমি কীভাবে পৌঁছাতে পারি তা-ও বলে দিলেন। পরদিন নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই পৌঁছে গেলাম যোধপুর পার্কের সেই বাড়ির সামনে। তিনি আমাকে আবিষ্ট করে রাখলেন প্রায় দুই ঘণ্টা। এরপর আরও বেশ কয়েকবার গিয়ে দাঁড়িয়েছি তাঁর সামনে। প্রতিবারই কিছু না কিছু নিয়ে ফিরেছি মননে।
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড নোট নিয়ে তখন আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে। আমি চাইলাম এবার তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে। তাঁর ফোন নম্বর পেলাম সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকায় ফোন করে। সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গ টানতেই বললেন, ‘এমনিতেই আমাকে গালাগাল দেওয়ার লোকের অভাব নেই। তুমি কি বাংলাদেশ থেকেও গালাগাল শোনানোর পরিকল্পনা করছ নাকি?’ নানা কথার পর রাজি হলেন সাক্ষাৎকার দিতে। কিন্তু সময় মিলছিল না। একদিন তিনি অক্সফোর্ড বুক স্টোরে এলেন তাঁর একসময়ের সহকর্মী অনিরুদ্ধ ধরের বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে। সেখানে গিয়ে পেলাম তাঁকে। কিন্ত বিতর্কিত বিষয়গুলোতে তেমন মুখ না খুলে বিদায় নিলেন আরেকদিন সাক্ষাৎকার দেবেন এই আশা প্রকাশ করে।
কলকাতা থেকে ফিরে এলাম ২০১৮-এর শেষদিকে। আবার গেলাম ২০১৯-এর জানুয়ারির শেষদিনে। উদ্দেশ্য চিকিৎসার পাশাপাশি কলকাতা বইমেলা দেখা। ততদিনে অনেকের সঙ্গে আলাপচারিতার ফলে জানতে পেরেছি কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা এক অনন্যসাধারণ মেলা।
সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যের লেখার সঙ্গে আলাপ উইকি নামের ক্রিকেটবিষয়ক একটি উপন্যাসের মাধ্যমে। তারপর তাঁর লেখা খেলাবিষয়ক দুটি বই পড়ি। তাঁকে কলকাতা বইমেলায় পেয়ে সাক্ষাৎকারের আশা প্রকাশ করি। তিনিও আশ্বাস দেন বইমেলা শেষে দেখা হবে। বইমেলা শেষে সংবাদ প্রতিদিন কার্যালয়ে যোগাযোগ করে একাধিকবারের চেষ্টায় নাগাল পাই গৌতম ভট্টাচার্যের। পড়ুয়া এক খেলাপাগল সাংবাদিকের সাথে আলাপচারিতায় শিখলাম এক নতুন দর্শন। সহজভাবে জীবনকে দেখার কৌশল।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী সময়ের জনপ্রিয় লেখক। তাঁর লেখা অনেক বই পড়েছি। বহুদূরের বাতিঘর মনে হতো বলে তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্ভব না বলেই ভেবে রেখেছিলাম। কলকাতা বইমেলায় আনন্দ’র স্টলের বাইরে একদিন তাঁকে দেখে চমকে উঠি। এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছেন, ঠিক যেন পাশের বাড়ির একজন লোক। বুকে সাহস নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে অভিপ্রায় জানালাম। তিনি আপাদমস্তক দেখলেন আমাকে। রাজি হলেন সাক্ষাৎকার দিতে। তবে সেটা অবশ্যই বইমেলা শেষ হবার পরে। যথা আজ্ঞা! বইমেলা শেষে কয়েকদিনের চেষ্টায় পাওয়া গেল বহু আকাঙ্ক্ষিত স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার। যতটা কথা তিনি মোবাইলের রেকর্ডার চালু অবস্থায় বলেছেন, তার চাইতে অনেক বেশি বলেছেন অফ দ্য রেকর্ড আড্ডায়৷ দারুণ এক প্রাণখোলা মানুষকে আবিষ্কার করলাম আমি। পূর্বপুরুষের বাংলাদেশকে বুকে রাখেন তিনি, বুঝলাম। আড্ডায়-গল্পে একটা বিকেল কখন সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।
সে বার কলকাতা থেকে ফিরে তিন মাস পর আবার গেলাম। প্রথম লক্ষ্য ঠিক করলাম প্রচেত গুপ্ত। আমি ভাবতাম তিনি আনন্দ গ্রুপে কোথাও চাকরি করেন। কিন্তু না, জানলাম তিনি আজকাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। ফলে আজকাল কার্যালয়ে যোগাযোগ করে তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম। তখন পুরো ভারতবর্ষজুড়ে নির্বাচন চলছে। ফলে, প্রচেত গুপ্ত এক মাস পর যোগাযোগ করতে বললেন। তাতেই রাজি আমি। এক মাস পর প্রচেত গুপ্তকে ফোন করতে তিনি যেতে বললেন সল্টলেকের ‘আজকাল’ কার্যালয়ে। আমার জন্য সেটি একটু দূর হয়ে যায়। তা-ও গেলাম। একাধিক দিনে শেষ করলাম সাক্ষাৎকার। এখানে একটা দুঃখের কথা উল্লেখ করি—শেষ যেদিন আমি প্রচেত গুপ্তকে সাক্ষাৎকারের ছাপা অংশ দেখাতে যাই ফিরতে কিছুটা রাত হয়ে যায়। ফেরার পথে অটোরিক্সায় একাকী যাত্রী ছিলাম আমি। অটোর ড্রাইভার এক নির্জন স্থানে অটো থামিয়ে আমাকে মুখে আঘাত করে এবং সাথে থাকা সব টাকা নিয়ে যায়। অনেক কষ্ট করে সেদিন ফিরতে হয়েছিল। প্রচেত গুপ্তের সাক্ষাৎকারের কথা ভাবতে বসলে যেমন তাঁর হাসিমুখ মনে পড়ে, পাশাপাশি সেই থাপ্পড়টির কথাও ভুলতে পারি না।
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায় বাতলে দিলেন প্রচেত গুপ্তই। সঞ্জীববাবুর ছেলে অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলতে বললেন। একটা ফোনেই কাজ হয়ে গেল। যেদিন ফোন করলাম তার পরদিন সন্ধ্যায় যেতে বললেন। দমদম থেকে সিথির মোড় হয়ে কুঠিঘাট পৌঁছে গঙ্গার হাওয়ায় মনটা আনন্দে নেচে উঠল। কিন্তু সেসব রেখে ঢুকলাম সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে। দারুণ মজার মানুষটি কথা দিয়ে মুগ্ধ করে রাখতে পারেন দারুণভাবে। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরে যখন লিখে সাক্ষাৎকারটা দেখানোর কথা বললাম, হাসি মুখে বললেন—দরকার নেই৷ কারও নামে মন্দ কিছু বলিনি বোধহয়। এরপর সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আর একবারই দেখা হয়েছে আমার। বাংলাদেশের পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের সপ্তাহে-ই (জুন ২০২২) আমি তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম আবার। পদ্মা সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন। দারুণ আড্ডা দিলেন। সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতে চাইলে মজা করে বললেন—‘আমার সামনে সাহিত্য আনবেন না। বড্ড জ্বালায় আছি!’
তিলোত্তমা মজুমদারের লেখা বেশ অন্যরকম। দীর্ঘসময় নিয়ে রাজপাট পড়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তাঁকে কোথায় পাওয়া যাবে প্রশ্নের উত্তরে প্রচেত গুপ্তই জানালেন যে, আনন্দ পাবলিশার্স—এ কাজ করেন তিলোত্তমা মজুমদার। সেখানে গিয়ে খোঁজ করতে তিলোত্তমাদিকে পেলাম। সাক্ষাৎকারের আগ্রহ প্রকাশ করতে জানতে চাইলেন আর কার কার সাক্ষাৎকার নিয়েছি৷ জানালাম। কিছুক্ষণ ভাবলেন। এরপর হ্যাঁ-বোধক উত্তরই জানালেন। আমিও ২ ধাপে সাক্ষাৎকার নিলাম। এরপর কম্পিউটারে লিখে, প্রিন্ট করে নিয়ে গেলাম তাঁকে দেখাতে। সেদিন তাঁর ব্যস্ততা ছিল। ফলে, বললেন রেখে যেতে। তিনি দেখে জানাবেন। পরদিন ফোন করে বললেন, তিনি ভুলগুলো শুদ্ধ করে রেখেছেন। আমি যেন গিয়ে নিয়ে আসি। যাওয়ার পর দেখতে পেলাম সেদিনও তিনি অনুপস্থিত। তবে এক সহকর্মীর কাছে সাক্ষাৎকারের কাগজ দিয়ে গেছেন। সম্পূর্ণ পেশাদারভাবে প্রুফ সংশোধনের কাজ করে রেখেছেন তিনি। তবে আমার অভিজ্ঞতা ছিল না এভাবে সংশোধন করার। দিদিকে জানাতেই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি না বলেছেন আপনার বই বেরিয়েছে? তাহলে প্রুফ দেখতে জানেন না কেন?’ কী উত্তর দেব? আমার বইয়ের প্রুফ যা দেখার সব কম্পিউটারে দেখে সংশোধন করেছি। চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। বাড়ি ফিরে একদিনের মধ্যেই প্রুফ কারেকশন সম্পূর্ণ করলাম। পরেরদিন আবার দিদির কাছে নিয়ে ভয়ে ভয়ে শুদ্ধ কপিটা দিলাম। তিনি ভালো করে পড়লেন। এরপর বলেন, ‘সব ঠিক হয়েছে তো। বললেন যে প্রুফ দেখতে জানেন না?’ দিদিকে জানালাম তাঁর কারণেই প্রুফ দেখার হাতেখড়ি হলো আমার।
অনেক লেখকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় পাচ্ছিলাম না। একে-ওকে জিজ্ঞেস করে কত আর পাওয়া যায় উপায়! এরকমই এক সময়ে আমাকে পথ দেখালো বার্তা প্রকাশনের সৌরভ বিশাই। সে আমাকে সাহিত্যের ইয়ারবুক-এর সঙ্গে পরিচয় করাল। সেখানে সব লেখক-সাহিত্যিকদের ঠিকানা মোবাইল নম্বর পেয়ে আমি তো অভিভূত। শুরু হলো ইয়ারবুক ধরে ধরে অভিযান।
উল্লাস মল্লিকের সঙ্গে দুবার সময় ঠিক করলাম তাঁর ডোমজুড়ের বাড়ি যাওয়ার। কিন্তু বৃষ্টি আর অসুস্থতার কারণে যাওয়া হলো না। এরমধ্যে একদিন তিনিই এলেন নন্দন চত্বরে কোনো একটা অনুষ্ঠানে। সেখানেই সাক্ষাৎকার চলল দীর্ঘ সময় ধরে।
সিজার বাগচীর ফোন নম্বর পেয়েছিলাম সাহিত্যের ইয়ারবুক থেকে। ফোন করে অভিপ্রায় জানাতে একদিন পর সময় দিলেন। আনন্দবাজার কার্যালয়ের উল্টোদিকের ‘ই-মল’-এর চারতলায় এক ক্যাফেতে প্রথম দিনের আড্ডা জমল। এরপর অসংখ্যবার তাঁর সঙ্গে দেখা, কফি খাওয়া, লাঞ্চ। কোথায়, কীভাবে যে সময় চলে যেত বুঝতেই পারতাম না! পরিচয়ের মাত্র তিন দিনের মধ্যে আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁদের সংগঠন ‘নিক্বণ’-এ। সে আরেক গল্প। সেখানে গিয়ে আলাপ হলো ‘নিক্বণ’-এর কর্ণধার পার্থ নাগ দাদার সঙ্গে। সত্যি বলতে পার্থ নাগের মতো এত আন্তরিক মানুষ আমি আমার জীবনে কমই দেখেছি। ‘নিক্বণ’ প্রতি বছর যে মেলা আয়োজন করে সেখানে প্রায় প্রতিবছরই যাই এখন।
সুবোধ সরকার পশ্চিমবঙ্গ কবিতা অ্যাকাডেমির সভাপতি। খুব হোমড়া-চোমড়া কেউ হবেন ভেবেছিলাম। কাছে গিয়ে ভুল ভাঙল। তিনি আমাদেরই মতো মাটিতে বাস করা একজন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তিন দিনব্যাপী। এই তিন দিনের মধ্যে দ্বিতীয় দিন আমাদের সাক্ষাৎকার নামের আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন আরেক কবি সৌরভ চন্দ্র। আমার পাশাপাশি তিনিও কিছু প্রশ্ন করেছিলেন সুবোধ সরকারকে। প্রশ্ন-উত্তরের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সেই কথোপকথনটিও রইল এই বইতে। আজ এই লেখার মাধ্যমে সৌরভ চন্দ্রকে স্মরণ করছি শ্রদ্ধাভরে। লক্ষ্য করুণ, ধন্যবাদ জানাচ্ছি—না স্মরণ করছি। কারণ কোভিড মহামারির মধ্যে সৌরভদা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন খুব অল্প বয়সে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
সুনীলগবেষক কবি রফিক উল ইসলামকে ফোন করে সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতেই সানন্দে রাজি হলেন। তাঁর সাক্ষাৎ পেলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিনের ঠিক আগের দিন নন্দন চত্বরে। খেতে খেতে আড্ডা-গল্প সবই হলো। বিদায়বেলায় তাঁর স্নেহের হাত মাথায় রেখে বললেন, ‘আবার দেখা হবে।’ অসংখ্যবার দেখা হয়েছে। তাঁর বাড়িতেও অসংখ্যবার গিয়েছি। পিতৃস্নেহে আমাকে বরাবরই বুকে টেনে নিয়েছেন রফিকদা।
কবি, ঔপন্যাসিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আত্মভোলা বললে বোধহয় খুব একটা ভুল হবে না। সাক্ষাৎকারের দিনক্ষণ ঠিক করে যেই স্কুলে তিনি চাকরি করেন সেখানে গেলাম। গিয়ে শুনলাম, বিনায়কদা আজ স্কুলেই আসেননি। কিংবা চলে গেছেন একটু আগে। শেষে একদিন পেলাম তাঁকে। ব্যস্ততার ফাঁকেও সাক্ষাৎকার দিলেন তিনি। বারবার জিজ্ঞেস করতেন, ‘এই প্রশান্ত, বল তো, নোয়াখালীতে এখনো দুর্গাপুজো হয়?’
২০১৯ সালের পুজোর সময়ে দেশে ফিরে আসি। এরপর আবার যাই ডিসেম্বরের শেষদিকে। কবি রফিক উল ইসলামের মাধ্যমে আলাপ হলো কবি কমল চক্রবর্তীর সঙ্গে। খুব অল্প সময়ের আলাপে ছোট্ট একটি সাক্ষাৎকারই নিতে পেরেছিলাম তাঁর। কিন্তু অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটেছিল। সাক্ষাৎকারে তিনি হঠাৎ বলেন, ‘ধ্বংসের পর আবারও ভেসে উঠবে নতুন সভ্যতা’—অবাক হলাম। এ আবার কেমন কথা! কিন্তু ঠিক তার তিন মাস পরেই পৃথিবীতে এল কোভিড নামের এক রোগ৷ আর প্রতিদিন যেন আমি কমল চক্রবর্তীর বলা কথাগুলো উপলব্ধি করতাম। দাদার সঙ্গে আর কখনো দেখা হয়নি। হলে অবশ্যই জানতে চাইতাম, সেদিনের সেই কথাটি তিনি কী ভেবে বলেছিলেন। এই বই যখন প্রকাশ হচ্ছে, তখন কবি কমল চক্রবর্তী আর সশরীরে আমাদের মাঝে নেই। হয়তো আছেন, বৃক্ষের মাঝে কোথাও!
কবি, ঔপন্যাসিক অংশুমান করের লেখায় খুব সহজিয়া একটি ভাব আছে। যেন সামনে বসে গল্প করে যান। তাঁর সাক্ষাৎকারের জন্য দীর্ঘদিন চেষ্টা করতে হয়েছে। কিন্তু সময় মিলছিল না। বইমেলা (২০২০) চলাকালীন একদিন তিনি নিজেই ডাকলেন তাঁর রাজারহাটের ফ্ল্যাটে। দারুণ আড্ডা জমে উঠল। মাঝে মাঝে এসে যোগ দিচ্ছিলেন দাদার মা-ও। মাসিমাকে দেখেই বুঝলাম অংশুমান করের এই প্রতিভার কিছুটা হলেও মায়ের থেকে পাওয়া।
সাহিত্যের ইয়ারবুক-এর বর্তমান সম্পাদক বিশ্বনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলাপ হয় লিটল ম্যাগাজিন মেলায় গিয়ে। তাঁর মাধ্যমে আলাপ হয় সাহিত্যের ইয়ারবুক-এর প্রতিষ্ঠাতা জাহিরুল হাসানের সঙ্গে। জাহিরুল হাসানের কিছু বইপত্র নেড়েচেড়ে দেখে বুঝলাম মহা পণ্ডিত ব্যক্তি। কী ভেবে তিনি লেখকদের নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বরযুক্ত একটি বই প্রকাশ করলেন জানার কৌতূহল হচ্ছিল। তাঁর খিদিরপুরের বাড়িতেই একদিন জমল আড্ডা। তারপর থেকে নিবিড় হয়েছে সম্পর্ক। লেখক-সাক্ষাৎকার গ্রহীতার সম্পর্ক নয়, পিতা-পুত্রের সম্পর্ক। যেকোনো সমস্যায় গিয়ে দাঁড়ানো যায় পিতৃতুল্য এই মানুষটির কাছে। উল্লেখ্য যে, এই সংকলনের দীর্ঘতম সাক্ষাৎকারটি জাহিরুল হাসানের।
শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। যাকেই জিজ্ঞেস করি, তিনিই অপারগতা জানান। সেটার সমাধানও পেলাম তাঁর বন্ধু অংশুমান করের কাছে। শ্রীজাতদার বাড়িতেই একদিন দীর্ঘসময় আড্ডায় বসে পাওয়া গেল এক জনপ্রিয় কবির ভেতরের লাজুক রূপের দেখা।
২০২০-এর ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফিরে মুখোমুখি হই ভয়াবহ কোভিড মহামারির। নিজেও আক্রান্ত হই। এরপর আবার কলকাতায় যাওয়া হয় সেই বছরের ডিসেম্বরে।
২০২১-এর জানুয়ারিতে সাক্ষাৎ ঘটে কার্টুনিস্ট সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। যার আঁকা-লেখা রাপ্পা রায় সিরিজ আমার অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা হয় তাঁর রাজপুর-সোনারপুরের বাড়িতে। একাধিক দিনের আলাপচারিতায় এক আত্মভোলা শিল্পীকেই যেন খুঁজে পেয়েছি বারবার।
২০২১-এর ডিসেম্বরে আবার কলকাতায় গিয়ে সাক্ষাৎকার নেই মনজিৎ গাইনের। তাঁর লেখালেখির একটা বিস্তৃত জায়গাজুড়ে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ফলে মিশে যেতে খুব একটা দেরি হয়নি। ধান্যকুড়িয়ার বিখ্যাত জমিদার বাড়ির সন্তান মনজিৎ গাইনের সঙ্গে তাঁদের বিখ্যাত বাড়ি দেখে বিস্মিত হয়েছি।
হিন্দিভাষী লেখিকা অলকা সারাওগীর সঙ্গে আমার আলাপ হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। বাঙালির বইপড়ার সম্পাদক জাহিরুল হাসান জোর করে করিয়ে নিয়েছেন এই সাক্ষাৎকারটি। তবে জেনে অবাক হয়েছি অন্য ভাষার একজন লেখিকা বুকে রাখেন বাংলাদেশকে, বাংলাকে।
ইদানীং ভূত-প্রেত-অলৌকিক বিষয়াবলি নিয়ে অনেক সাহিত্য হচ্ছে। সেই ধারায় আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র কালীগুণীন। কালীগুণীনের স্রষ্টা সৌমিক দে’র সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো সল্টলেকে। এক সন্ধ্যা জুড়ে হেঁটে, বসে, দাঁড়িয়ে যে আড্ডা দিয়েছিলাম অনেকদিন মনে থেকে যাবে সেটা। যেভাবে সৌমিকদা ভূতের গল্প করছিলেন আমি মাঝে মাঝে চমকে উঠছিলাম, আশে-পাশে তেনারা কেউ নেই তো!
এই সংকলনে যে ২০ জনের সাক্ষাৎকার আছে, তাঁদের সবাই আমার অত্যন্ত প্রিয়। ক্রম করা হয়েছে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়কাল অনুযায়ী। এর মধ্যে আরও বেশ কিছু সাক্ষাৎকার আমি নিয়েছি। সেগুলো হয়তো শেষ করা হয়নি নানা কারণে। আগামীতে অবশিষ্টগুলো নিয়ে আবার পাঠকের সামনে আসার স্বপ্ন দেখি। শুধু আফসোসের জায়গা একটাই, যার লেখা পড়ে সবচেয়ে বেশি আপ্লুত হই, সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে সাক্ষাতে কথা বলা হলো না।
শ্রদ্ধেয় বারিদবরণ ঘোষকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ জানাই অসুস্থতার মধ্যেও আমার অনুরোধে দারুণ রসসিক্ত একটি মুখবন্ধ লিখে দেওয়ার জন্য।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন যদি আমি নাম ধরে ধরে করতে যাই, তাহলে বোধকরি বইয়ের একটা ফর্মা বেড়ে যাবে। তাই সেই চেষ্টা করলাম না। আমার পরিবারকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ আমাকে সহ্য করার জন্য।
স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশনের প্রকাশক আবু সাঈদকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই—আমার স্বপ্নটাকে বাস্তব করার জন্য।
আপনাদের ভালো-মন্দ যেকোনো মতামতের প্রত্যাশায় রইলাম।
প্রশান্ত ভৌমিক