ভূমিকা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের ভ‚মিকা সর্বদাই তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। ঔপনিবেশিকাল থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জাতীয় সংকটে ছাত্রসমাজের ভ‚মিকা অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ছাত্র আন্দোলনের চরিত্র, মনন ও কাঠামো কিছুটা পরিবর্তিত হলেও এর মূলে ছিল ন্যায়বিচার, সমতা ও সামাজিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা।
একবিংশ শতাব্দীতে ছাত্র আন্দোলন নতুন ইস্যু ও প্রশ্নকে জনসম্মুখে তুলে এনেছে, যা কেবল শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয় বরং সামগ্রিকভাবে জাতীয়জীবনে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সা¤প্রতিক সময়ের আন্দোলনসমূহ তথা- নো ভ্যাট অন এডুকেশন, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শিক্ষকদের পে-স্কেল আন্দোলন এবং সর্বজনিন পেনশন স্কিম প্রত্যয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন তরুণ সমাজ ও শিক্ষকদের পরিবর্তিত চাহিদা, রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি অসন্তোষ এবং নতুন সামাজিক চেতনার বিস্ফোরণ।
২০১৫ সালের নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিয় কলেজের শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক সূচনা ও সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথম রুখে দাঁড়ানো। সরকারের আরোপিত ভ্যাট শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ার পায়তারাকে রুখে দেয়। এ আন্দোলনের সময় আমি স্টেট ইউনিভার্সি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে উপদেষ্টা হিসেবে আন্দোলনটি মুখপাত্র (প্রধান সমন্বয়) আমার ছাত্র ফারুক আহমাদ আরিফ, তার সহযোগী খায়রুল ইসলাম বাশারসহ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা এবং দিকনির্দেশনা দেই। সেখানে বর্তমানে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ, অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম ও ড. আসিফ নজরুল, সজীব সরকার স্যার ছাত্রদের নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করায় ছাত্ররা দীর্ঘ ৪ মাসের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বিজয়ী হয়ে ক্লাসে ফিরে। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানদের হাতে লাঠিচার্জ, গুলিসহ নানাভাবে চরম নির্যাতন ও অবিচারে আক্রান্ত হয়েও কোন ধরনের ক‚টক্তি ও ভাঙচুর করেনি। যা বিশ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন ছাত্রদের আরেকটি নতুন দিগন্তের সূর্যদয়। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে এ আন্দোলন ছিল মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিতের দাবিসম্বলিত। এটি মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অথচ রাজনৈতিক স্বার্থহাসিলের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি পর্যন্ত এই কোটা পদ্ধতি টেনে এনে চাকরির দুয়ারে মেধাবীদের জন্য তালা এটে দেওয়া হয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন ফেব্রæয়ারি থেকে দ্রæত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। নানা ধরনের তালবাহানার পর ১১ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কোটাপদ্ধতি বাতিল করে। ছাত্ররা বিজয়ী হয়। অবশ্য পরবর্তী বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সরকার অক্টোবরে গিয়ে কোটাপদ্ধতির নিরসন করে।
২০১৮ সালে রাজধানীর শহিদ রমিজউদ্দীন স্কুল এন্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসের আঘাতে নিহতের ঘটনা ও তৎকালীণ নৌপরিবহন মন্ত্রীর তাচ্ছিল্যপূর্ণ হাসি ও কথায় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন গঠিত হয়। এটিকে কেন্দ্র করে ২৯ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গড়ে তোলে। তারা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সড়কে নেমে শুধু সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবাদ করেনি, বরং রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অবহেলার বিরুদ্ধে এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতার চেতনা প্রকাশ করেছে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সরকারি চাকরি তথা কর্মসংস্থানে অসাম্য, সমাজে ক্রমবর্ধমান ধনী-গরিব বৈষম্য এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলা এই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। আন্দোলনটি কেবল শিক্ষার্থীদের সীমিত দাবি না থেকে তৎকালীণ সরকারের অবিচার, লুণ্ঠন, হত্যা-গুমসহ সামাজিক ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় গড়ে উঠে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালানোর মাধ্যমে আন্দোলনটি শেষ হয়।
২০১৫ সালে আলোচিত পে-স্কেল আন্দোলন শিক্ষক সমাজকে নাড়া দেয়। তারা সংগঠিত হয়ে সরকারের সেই অন্যায়ভাবে গঠিত পে-স্কেলের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আন্দোলন করে বিজয়ী হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে পেনশন স্কিম আন্দোলন শিক্ষকদের আবারো ক্লাস-পরীক্ষা করে রেখে রাজপথে নামিয়ে আনে। দুটি আন্দোলনেই শিক্ষকরা বিজয়ী হয়।
বাংলাদেশের ছাত্রবিপ্লব: নো ভ্যাট অন এডুকেশন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বইটিতে এই ৬টি আন্দোলনের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে। বইটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশাপাশি জনসাধারণের অংশগ্রহণের চিত্র, জাতীয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের লেখা স্থান পেয়েছে।
রাজনৈতিক ও শিক্ষাঙ্গানের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য বইটি একটি অসাধারণ সংকলন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের ছাত্র ও শিক্ষক আন্দোলন নিয়ে এটিই প্রথম বই। বইটি সকল স্তরের মানুষকে গবেষণা ও শিক্ষা নিতে সহযোগিতা করবে।
অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস
প্রধান সম্পাদক
বাংলাদেশের ছাত্রবিপ্লব: নো ভ্যাট অন এডুকেশন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন