আমার লেখালেখির বয়স আর নজরুল-চর্চার বয়স প্রায় সমান। ১৯৮৫ সালে প্রথম বই বের হয়; আর ১৯৮৮ সালে নজরুলকে নিয়ে আমি একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে ফেলি। সেটি ছিল এক জাঁদরেল গবেষকের বিরুদ্ধে। তিনি নজরুলকে জাতীয় কবি করার প্রস্তাব মানতে নারাজ। যদিও আজ বুঝি, নজরুল-রবীন্দ্রনাথ এমনকি অন্য কোনো কবিকেও জাতীয় কবি কিংবা পুরস্কার কিংবা খেতাব দিয়ে বড় করা যায় না। তবে সেই সময়ের লেখাটি নজরুল গবেষক ও ভক্তদের মধ্যে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। নজরুল-গবেষক কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ, দরবার আলম, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং অনেকে সরাসরি দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। আর এই ঘটনার সঙ্গে আমার নজরুল চর্চার সম্পর্ক যুক্ত হয়ে আছে।
নজরুলকে নিয়ে এই রচনা আমার ভবিষ্যৎ চাকরিও নিশ্চিত করেছিল, দৈনিক বাংলার সম্পাদক আহমেদ হুমায়ূন দেখার ইচ্ছে পোষণ করেছিলেন এবং পরে দৈনিক বাংলায় চাকরির প্রস্তাব করেন। যদিও লেখাটি আজ আর আমার সংগ্রহে নেই; কিন্তু নজরুলকে নিয়ে সেই লেখার মূলভাব ও তাগিদ এখনো মনে আছে। এই ঘটনার পরে দৈনিক বাংলা আমাকে দায়িত্ব দেয়- তৎকালীন চার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন নজরুল গবেষকের সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী আব্দুল মান্নান, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল কাইউম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ। সাক্ষাৎকারটি দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীর চার পৃষ্ঠাব্যাপী ছাপানো হয়েছিল।
১৯৯৪ সালে নজরুল গবেষণার জন্য একটি সুযোগ এসে গেল। সদ্যপ্রতিষ্ঠিত নজরুল ইনস্টিটিউট বিভিন্ন বিষয়ে নজরুল গবেষণার জন্য দশটি বৃত্তি প্রস্তাব করে। আমি অফিস থেকে বিনাবেতনে ছুটি নিয়ে- সে সময়ে এক বছর মেয়াদি বৃত্তির অধীনে ‘নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র’ নামে একটি অভিসন্দর্ভ রচনা করি। এটি নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে আমি নিজেকে নজরুল গবেষক হিসাবে পরিচিত করতে চাইনি। কারণ, আমার নিজের কবিতা, গল্প, কথা-সাহিত্য, প্রবন্ধ এবং স্বাধীন চিন্তা ও সৃষ্টিশীল রচনার চাপ সব সময় ছিল- তার বাইরে গিয়ে একক নজরুল চর্চা আমার জন্য সম্ভব ছিল না। কিন্তু নজরুল আমাকে ছাড়েনি কখনো- নজরুলের সাহিত্য ও জীবন সব-সময় আমাকে তাড়িত করেছে। কারণ, ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ যে ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে- যাচ্ছে, তাতে নজরুল সব সময় প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকছে। একটি দেশের মানুষের জন্য মানবিক দার্শনিক চিন্তা তাঁকে ছাড়া পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি প্রায় অসম্ভব।
জাতি যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সংকটে পড়ে, জাতি যখন শোষণ ও বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয়, পরাধীনতার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়, নারী-পুরুষের সামাজিক বিভেদ প্রবল হয়ে দেখা দেয়, তখন নজরুল অনিবার্য হয়ে আসে। কোনো ভেদবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এবং বর্ণবিভেদ- নজরুল চর্চার উপযুক্ত নন। নজরুলকে মানুষ- তাদের নিজ প্রয়োজনে অংশত পাঠ ও গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু নজরুল সাহিত্য জীবন ও তাঁর শিক্ষাকে খণ্ডিত করতে পারে না। যদিও সর্বত্র খণ্ডিত নজরুল চর্চার জয় জয়কার।
নজরুল নিয়ে অনেক প্রবন্ধ অনেক বই লিখেছি; কিন্তু নজরুল-জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘তুমি শুনিতে চেয়ো না’ লেখার আগে নজরুলের আত্মা সঠিকভাবে আমার কাছে ধরা দেয়নি। এই গ্রন্থ লেখার সময় আমার আত্মার একটি বদল ঘটেছিল- নজরুলের সঙ্গে। নজরুল এসে ভর করেছিলেন আমার ওপর। আমি রচনা করেছিলাম- তাঁর চৌত্রিশ বছরের নির্বাক জীবনের বয়ান। এই গ্রন্থে নজরুল কবরে শুয়ে নিজেই নিজেকে তাঁর একমাত্র জীবিত সন্তান সব্যসাচীর কাছে অব্যক্ত কথা প্রকাশ করেছিলেন।
বর্তমান গ্রন্থটি বিভিন্ন সময়ে লেখা প্রবন্ধের সমষ্টি। দুএকটি অভিভাষণও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কের ধরন’ ও ‘নজরুল ও জীবনানন্দ তুলনামূলক আলোচনা’। নজরুল নিয়ে অনেক নতুন পর্যবেক্ষণ এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আশা করি নজরুল চর্চার পথে পাঠককে নতুন করে আলো দেবে।
— মজিদ মাহমুদ
নভেম্বর ২০২৫