ভূমিকা
তাকলিদ ও বর্তমান পরিস্থিতি
তাকলিদ করা এবং না করার মাসআলাটি বিগত প্রায় একশ বছর যাবৎ একটি চরম উত্তেজনামূলক আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অধম তাকলিদ করা বা না করার বিষয়ে কিছু লিখব, তা কখনো চিন্তাই করিনি। কারণ, দ্বীনের সেবক ও ধারক-বাহকদের সামনে এখন চেষ্টা ও কর্মে শ্রম দেওয়ার জন্য অনেক ময়দানই খালি পড়ে আছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দ্বীন-ধর্মের ক্ষেত্রে নানাবিধ ফিতনা অসংখ্য মানুষের ঈমান হরণ করছে। কবির ভাষায় বলা যায়-
ہو گیا مانند آب ارتزان مسلمان کا لہو
'মুসলমানদের খুন তো বর্তমানে মূল্যহীন পানি হয়ে গেছে।'
বর্তমানে এটাই বাস্তব অবস্থা। তাছাড়া নানান সংকট ও সমস্যা মুসলিম উম্মাহর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিচ্ছে। কিন্তু আফসোস। এখনও মুসলমানগণ জুলুম-ফাসাদ ও বদ-দীনির এই যুগেও নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও আত্মকলহে ডুবে আছে।
তাকলিদ করা বা না করার ইখতিলাফি মাসআলাটিও এমন। কয়েক বছর যাবৎ এই মাসআলাকে ভিত্তি করে সরলমনা মুসলমানদের মাঝে মুক্তচিন্তার নামে এরূপ বিক্ষিপ্ততা ছড়ানো হচ্ছে যে, এখন মুসলমানদের কোনো বসতিই এই আলোচনা থেকে মুক্ত নয়। কিছু গোঁড়া ব্যক্তিও সাধারণ মানুষের মাঝে অপপ্রচার চালাতে শুরু করেছে, কয়েক শতাব্দী যাবৎ তারা অটল-অবিচলভাবে চার মাযহাবের যে কোনো একটির তাকলিদ করে আসছে, তা নাকি সুস্পষ্ট বাতিল, হারাম ও শিরকি কাজের অন্তর্ভুক্ত!
ভারত উপমহাদেশে এই আন্দোলন এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলমান। কিছু বিশেষ কারণে (যার বিস্তারিত বিবরণের স্থান এটি নয়)
বিগত কয়েক দশক যাবৎ এ অপতৎপরতা ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে।
তাকলিদের বিরুদ্ধে তারা অসংখ্য পুস্তিকা, লিফলেট প্রকাশ করে জনসাধারণের মাঝে বিনামূলে বিতরণ করছে। বিশেষত যুবক শ্রেণিকে টার্গেট করে এসব কর্মকাণ্ড বেশি চালানো হচ্ছে।
অথচ এসব যুবকরা যখন খারাপ ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকে তখন কেউ তাদেরকে মদপান ও জুয়া খেলা ছেড়ে নামাজ পড়ার জন্য দাওয়াত দেয় না। কিন্তু যখন এরা মসজিদে আসতে শুরু করে তখন তাদের মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। এরা যুবকদের মাঝে নামাজের পদ্ধতি ও শরিয়তের মতবিরোধপূর্ণ মাসআলা ইত্যাদি বিষয়ে নানান পুস্তিকা বিতরণ করে। কখনো কোনো শাখাগত মাসআলা যেমন, ইমামের পেছনে মুক্তাদির কিরাত পড়া ইত্যাদি বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট পুস্তিকা বিতরণ করা হয়।
যাতে একতরফাভাবে খণ্ডিত আলোচনা উল্লেখ করে এরূপ উসকানিমূলক কথা বলা হয় যে, সারা দুনিয়ায় মুকাল্লিদরা যে পদ্ধতিতে নামাজ পড়ছে তা সুন্নাহের বিপরীত। এসব বিষয় ধর্মীয় জ্ঞানে সম্পূর্ণ অনবহিত ও অজ্ঞ জনসাধারণের মাঝে কীরূপ প্রভাব ফেলে- তা একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই বুঝতে পারেন।
সত্য বিবর্জিত ও নির্বুদ্ধিতামূলক এ ফিতনা থেকে আজ জল-স্থলভাগের কোনো স্থানই নিরাপদ নয়। আরব-অনারব এবং ইউরোপ-আমেরিকাসহ সর্বত্রই অজ্ঞ-মূর্খ জনসাধারণের মাঝে সুকৌশলে এ প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহে বসবাসরত মুসলমানেরা দ্বীন ও ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে কতটা মারাত্মক ঝুঁকির মাঝে আছে- তা একমাত্র সেখানকার অধিবাসীরাই জানেন কিংবা সেখানকার আলেম-উলামা ও দায়িদের সাথে সম্পর্ক আছে, এমন লোকেরাই জানেন। অধিকাংশ মুসলিম যুবকই পাশ্চাত্যের নির্লজ্জ জীবনযাপন এবং ঈমানের পরিপন্থি সভ্যতা-সংস্কৃতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশগুলোতেও পাশ্চাত্যের শিক্ষা-দীক্ষা ব্যাপক হারে বদ-দীনি ছড়াচ্ছে। আফসোসের কথা হচ্ছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের নিজস্ব সভ্যতা-সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। এর কারণে আমাদের সম্প্রদায়ের বিরাট অংশ ঈমান, হায়া ও লজ্জাশীলতা থেকে দূরে সরে গেছে। খোদ পশ্চিমা সভ্যতায় লালিত-পালিত ও বেড়ে উঠা প্রজন্মের দ্বীন-ধর্মের অবস্থা কতটা নাজুক, তা অবর্ণনীয়। অথচ সেখানেও মসজিদে মসজিদে এসবমতবিরোধপূর্ণ মাসআলা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অধিকাংশ এলাকার অবস্থাই কম-বেশি এমনই। পৃথিবীতে যারাই ধর্মীয় ক্ষেত্রে জনসাধারণের মাঝে সংশোধনমূলক কাজ করতে চায় এবং মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় জীবনের গুরুত্ব বিষয়ে মৌলিকভাবে কাজ করতে আগ্রহী, তারা সবসময় নিজেদের যাবতীয় কার্যক্রম নিরেট ইতিবাচক দাওয়াতি এবং সংশোধনমূলক কাজের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। অথচ তাকেও সবসময় এসব মাসআলার মুখোমুখি হতে হয়। এ ব্যাপারে আমার অভিমত হচ্ছে, যখনই পৃথিবীব্যাপী জনসাধারণের মাঝে কাজ করা হবে তখনই এসব মাসআলা ও সমস্যা সামনে এসে দাঁড়াবে।
বস্তুত যদি বাড়াবাড়ি না করা হয় তবে তাকলিদ উম্মতের কাছে একটি সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্য বিষয়। সকল নির্ভরযোগ্য আলেমই এ বিষয়ে একমত যে, মতবিরোধপূর্ণ ফিকহি মাসআলায় ইমামদের যে কোনো মতই গ্রহণ করার সুযোগ আছে। কিন্তু এসব মতবিরোধের দ্বারা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা বা তাদেরকে হতাশাগ্রস্ত করা কিংবা তাদের মনে মাযহাবের আলেমদের ব্যাপারে অমূলক ধারণা জন্ম দেওয়া বিরাট অন্যায়। তাছাড়া এসব মাসআলা নিয়ে মুনাজারা বা বিতর্কে লিপ্ত হওয়া মারাত্মক ধরনের প্রান্তিকতা ও বাড়াবাড়ি। এটি এমন এক ফিতনা- যার কারণে উম্মাহর ঐক্য ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। অনলাইনে বা পত্র-পত্রিকায় এখন এসব ব্যাপারে এত বেশি লেকচার ও প্রবন্ধ চোখে পড়ে যে, দেখে কলিজা ছিঁড়ে যায়। আল্লাহ আমাদেরকে এসব ফিতনা থেকে রক্ষা করুন।
জনাব তাওসিফুর রহমান রাশেদ নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, (এগুলো কেবল পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করুন!)
'নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবর্তে পীর-ফকির ও ইমামদের আনুগত্য করার দাবিদারদের পেছনে নামাজ আদায় করা হারাম। আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ তাদেরকে মুরতাদ সাব্যস্ত করে হত্যা করা ওয়াজিব বলে ফায়সালা দিয়েছেন!'
তার এই ভাষ্যটি যে পুস্তিকায় ছাপা হয়েছে, তার নাম
کیا علما نے دیو بند اہل سنت و الجماعت ہیں
'উলামায়ে দেওবন্দ কি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারী?' এটি সৌদি আরবের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন দাওয়া ও ইরশাদ বিভাগ থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। পরবর্তীতে দিল্লির জমইয়তে আহলে হাদিসের জিম্মাদার হাফেজ শাকিল আহমাদ মিরাঠি একটি ভূমিকা সংযুক্ত করে মাকতাবা দারুল কুতুবিল ইসলামিয়া থেকে প্রকাশ করেছে।
গোঁড়ামি ও ফিরকাবাজীমূলক এসব বাড়াবাড়ি এখন এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে, হকের পতাকাবাহী উলামায়ে দেওবন্দ তথা মুসলমানদেরকে কাফের আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তাদেরকে হত্যা করা আবশ্যক বলে ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে। (নাউজুবিল্লাহ!)
তাদের এসব অপকর্মের বিষয়ে সরলমনা মুসলমানদের সচেতন থাকতে হবে। সব মুসলমানকে কাফের-মুরতাদ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে, এরূপ সিদ্ধান্ত দেওয়ার পেছনে তাদের হত্যা ও খুনাখুনির মানসিকতাই স্পষ্ট হয়। এখন তো তাদের এই মনোবাসনা পূরণও হতে চলেছে। প্রথম যুগের খারেজি ফিতনার উত্তরাধিকারীরা 'জামাআতুত তাকফির ওয়াল হাজারাহ' নামে আরব রাষ্ট্রগুলোতে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এ দলটি সব মুসলমানকে হত্যা করা জায়েজ; বরং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরজ ঘোষণা করেছিল।
এসব উগ্র চিন্তা-ভাবনা সংশ্লিষ্ট রচনাগুলোকে এখন পুস্তিকাকারে মানুষের মাঝে ব্যাপক আকারে বিতরণ করা হচ্ছে। প্রসিদ্ধ আহলে হাদিস আলেম জনাব মুহাম্মাদ জৌনগরি 'আহনাফ আওর আহলে হাদিস কা ফরক' নামে একটি পুস্তিকা লিখেছে। সেখানে তাকলিদ ও মুকাল্লিদদের ব্যাপারে সে লিখেছে, 'তাকলিদে শাখসি তথা ব্যক্তিকেন্দ্রিক তাকলিদ করার মানে হচ্ছে, ইমামকে নবি মানা।'
আরও লিখেছে, 'ইমামদেরকে মানা (হিন্দুদের দেবতা) কালি ও ব্রাহ্মণকে মানার নামান্তর।১
অথচ তার এ বক্তব্য ভুল আখ্যায়িত করার মতো লোক তাদের পুরো জামাতে কেউ নেই। এক্ষেত্রে উসুলের বুলি আওড়িয়ে মুনাজারা ও বিতর্কের পন্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ফিকহের কিতাবাদিতে তাহারাত, লজ্জাস্থান, নাপাকি ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট যেসব মাসআলা বর্ণনা করা হয়েছে তা মূলত এ জন্যই যে, নিত্যদিন মানুষকে সেসব মাসআলার মুখোমুখি হতে হয়। এখন এগুলো চিহ্নিত করে বলা হচ্ছে, দেখুন! ফিকহে হানাফি কত নাপাক। তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি ফিকহশাস্ত্রকে کوک سائر 'কোকশাস্ত্র'ও বলে আখ্যায়িত করেছে।২
এমনিভাবে যদি ফিকহে হানাফির কোনো কিতাবে অসর্তকতার দরুণ কোনো ভুল কথা লেখা হয় এবং পরবর্তী হানাফি আলেমগণ একে পরিস্কার ভাষায় ভুল আখ্যা দিয়ে বলেন, এ কথাটি ভুল, তথাপি ওইসব ভাইয়েরা মানুষদের মাঝে ভুল ও অমূলক ধারণা সৃষ্টির জন্য এ ধরনের ভুল কথাগুলো প্রচার করে বেড়ায়। অথচ একথা আর বলে না যে, এটা এমনই কথা- স্বয়ং হানাফিদের পক্ষ থেকে যা ভুল আখ্যায়িত করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং হানাফি মাযহাবের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে 'আদ-দুররুল মুখতার' গ্রন্থে একটি পঙক্তি উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
فَلَعْنَةُ رَبِّنَا أَعْدَادُ رَمَلٍ عَلَى مَنْ رَدَّ قَوْلَ أَبِي حَنِيفَةَ.
'আমাদের রবের পক্ষ থেকে ধূলিকণার সংখ্যা পরিমাণ লানত বর্ষিত হোক ওই ব্যক্তির ওপর, যে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর কথা রহিত করে দেয় বা বাদ দিয়ে দেয়।'
এতে কোনো সন্দেহ আছে কি যে, এ কথাটি স্পষ্টতই বাড়াবাড়িমূলক? স্বয়ং হানাফি আলেমদের পক্ষ থেকে এ কথাটিকে ভুল বলা হয়েছে। 'আদ-দুররুল মুখতার' গ্রন্থের প্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনে আবেদিন শামি রহ. বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দলিল ও মাযহাব না মানে তবে তার ওপর লানত ও অভিশাপ দেওয়া জায়েজ নেই। এটা তখনই বৈধ হবে যখন কোনো ব্যক্তি ই
সলামি শরিয়তকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তা বাতিল সাব্যস্ত করবে।