ইবনে কাছীর (রহ.) ছিলেন একজন মুহাদ্দিস, ফকিহ, মুফাসসির ও ইতিহাসবিদ । তাঁর পুরো নাম আবুল ফিদা হাফিয ইমাদ উদ্দীন ইসমাঈল ইবন আবু হাফস উমার ইবনে কাছীর ইবনে দিয়া আল-কুরায়শী আল-বুসরী আশ-শাফিঈ (রহ.)। তিনি বহু গ্রন্থ প্রণেতা। তাঁর রচিত তাফসীরের জন্য তিনি অধিক প্রসিদ্ধ । আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ.) কর্তৃক আল-কুরআনের ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ হিসেবে লিখিত ‘তাফসীর আল-কুরআনিল আজীম’ গ্রন্থটিই মুসলিম বিশ্বে ‘তাফসীর ইবনে কাছীর’ নামে বহুল পরিচিত। এটি বিশ্বের মুসলমানদের নিকট বিশেষভাবে সমাদৃত তাফসীর । এই তাফসীরকে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা হয় । বর্তমানে এই তাফসীর গ্রন্থটি বিশ্বের একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে; যার মধ্যে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও হিন্দি প্রধান । বাংলায় মূল গ্রন্থটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে, যা অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও শিক্ষাবিদ মরহুম অধ্যাপক আখতার ফারূক ।
পরবর্তীতে সৌদি আরব-এর বাদশাহ আবদুল আযীয ইউনিভার্সিটির তাফসীর, শরীয়াহ ও ইসলামী শিক্ষা বিভাগের প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আলী আস-সাবূনী উক্ত গ্রন্থটির একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রণয়ন করেন । তিনি উক্ত সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন, “প্রকাশ থাকে যে, তাফসীর গ্রন্থটি সংক্ষিপ্ত করার অর্থ এই নয় যে, আমরা এর কিছু অংশ অবহেলা করে বাদ দিয়েছি । বরং এর কিছু অংশ বিলোপ করলেও আমরা যা করেছি তা শুধুমাত্র অপ্রয়োজনীয় বিষয়াবলী, যেমন একই বর্ণনার পুনরুল্লেখ, সনদসূত্র সংক্রান্ত দীর্ঘ আলোচনা, দুর্বল বর্নণা এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দেয়া ছাড়াস আর কিছুই নয়। তাফসীরের প্রাণ আগে যেমন ছিল. এখনো শুভ্র উজ্জ্বল পোষাকে দাগহীন সৌন্দর্যে তেমনই আছে।
আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. এর জন্ম ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে বসরার (বর্তমান সিরিয়া) মামলুক সালতানাতে। তার পুরো নাম ইসমাঈল ইবন উমর ইবন কাসীর ইবন দূ ইবন কাসীর ইবন দিরা আল-কুরায়শী হলেও তিনি ইবনে কাছীর নামেই সমধিক পরিচিত। তিনি কুরায়েশ বংশের বনী হাসালা গোত্রের সন্তান। তার জন্মস্থান এবং জন্ম তারিখ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তার শিক্ষাজীবন এবং শৈশব নিয়েও খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। তবে মামলুক সালতানাতেই তিনি বড় হয়েছেন, এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদগণ নিশ্চিত। কৈশোরে তিনি ফিরিঙ্গীদের যুদ্ধ, ক্রুসেড, তাতারদের আক্রমণ, শাসকদের অন্তর্কোন্দল, বিদ্রোহ করে ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির মতো যাবতীয় দুর্যোগ আর দুর্দশা দেখে দেখে বড় হয়েছেন। কর্মজীবনে ইবনে কাছীর রহ. উন্মুসসা’ ওয়াত তানাকুরিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছেন। কুরআন, হাদিস, তাফসির, ইতিহাস, গণিত সহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি বিচরণ করেন। শায়খ তকী উদ্দী (রহঃ), উস্তাদ হাজরী (রহঃ), ইবনুল কালানসী (রহঃ) প্রমুখ প্রবাদত্যুল্য শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। পরবর্তীতে নিজের জ্ঞানের আলোয় তিনি আলোকিত করেছিলেন মধ্যযুগীয় মুসলিম জ্ঞানপিপাসুদের। ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে দামেস্কে তার মৃত্যু হয়। আল্লামা ইব্নে কাছীর রহ. এর বই সমূহ ইসলামি দর্শন, ফিকহ শাস্ত্র, তাফসির ও ইতিহাস নির্ভর। তার রচিত ‘তাফসিরে ইবনে কাছীর’-এর জন্য তিনি বিশ্বজোড়া সমাদৃত। পবিত্র কুরআনের কাছীরগুলোর মাঝে তার এই গ্রন্থটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং প্রামাণ্য। ১১ খণ্ডে প্রকাশিত ‘তাফসিরে ইবনে কাছীর’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’, ‘কিতাবুল আহকাম’ সহ বেশ কিছু জ্ঞানগর্ভ বই রয়েছে আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. এর বই সমগ্রতে।