মনুস্মৃতি এমন একটি প্রাচীন শাস্ত্রীয় গ্রন্থ যেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণ নিপীড়ন ও নারী অবমাননাকে অসঙ্কোচে মহিমান্বিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে গ্রন্থটিকে তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষকে নিপীড়ন করা ও অবদমিত রাখার গোঁড়া ধর্মীয় অনুশাসন হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ বিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষে সাভারকার, গোলওয়ালকারের মতো হিন্দুত্ব আন্দোলনের পথিকৃৎদের বারে বারে মনুস্মৃতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখেছি আমরা। হিন্দুত্ব শব্দবন্ধের স্রষ্টা সাভারকারের মতে মনুস্মৃতিই 'ভারতের সবচেয়ে বেশি ভজনাযোগ্য ধর্মশাস্ত্র', ‘আমাদের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, চিন্তা-ভাবনা ও চর্যার ভিভি' এবং তা 'আমাদের জাতির আধ্যাত্মিক ও দৈবিক অগ্রগতিকে বিধিবদ্ধ করেছে'। আবার গোলওয়ালকারের মতে মনুই মনুষ্যজাতির কাছে সর্বপ্রথম, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রাজ্ঞ আইন-প্রণেতা'। এই হিন্দুত্ববাদী শক্তিই আজকের ভারতবর্ষে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। এরা যে শুধুমাত্র আমাদের সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলিকেই অস্বীকার করে চলেছে তাই নয়, গোটা সংবিধানের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। পেশির আস্ফালনে বিশ্বাসী আগ্রাসী এই স্বৈরশক্তির কর্তৃত্ববাদী কার্যকলাপে প্রতিটি স্যাংবিধানিক সংস্থাই ক্রমশ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ভারতবর্ষের বর্তমান রাজনৈতকি গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে এটুকু অন্তত বলা যায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও অবধি বিভেদকামী শক্তিকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে তাঁদের লড়াই জারি রেখেছেন। এতদসত্ত্বেও বেপরোয়া এই শক্তি এখনও রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। এতদিনকার ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষে এ জাতীয় মৌলবাদী ফ্যাসিস্ত শক্তির উত্থানের বিপদের গুরুত্ব উপলব্ধিতে সাহায্য করতে এবং এই শক্তির পরাজয় সুনিশ্চিত করতে জনমত গড়ে তোলার জন্য সহায়ক হবে এই পুস্তক।