কবিগায়ক রূপমকে নিয়ে কবি জয় গোস্বামী এ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘রূপম ইসলাম সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে, পুরনো ঐতিহ্যের মধ্যে নতুন স্রোত ঢুকিয়ে দেখতে চেয়েছেন কী শিল্প আবিষ্কৃত হয়! তাঁর আবিষ্কার সফল হয়েছে, এখন তা সর্বজনস্বীকৃত। …এসে গেছেন নতুন এক শিল্পী যিনি তাঁর কবিতার মধ্যে সুর সংযোজন করে এবং নিজে তাঁর গায়নরূপ প্রকাশ করে তাঁর শ্রোতাদের মুগ্ধ করছেন না শুধু, করছেন ক্রুদ্ধ, বিচলিত ও উন্মত্ত। যদি রূপম ইসলামের একক অনুষ্ঠানের সাক্ষী হওয়া যায় তবে বোঝা যাবে তরুণ-তরুণীরা সত্যিই কীভাবে উন্মত্ত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠছেন তাঁর গানের সঙ্গে। এ ছাড়া শুধু মুগ্ধ করা এই শিল্পীর উদ্দেশ্য নয়।’ কেননা যে রক-সংগীতের ধারা রূপম সৃষ্টি করে চলেছেন তা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত অনাবিষ্কৃত এক দৃষ্টিকোণ আমাদের সামনে তুলে ধরে। যে আবিষ্কার-যাত্রাপথে রূপম মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা শয়তানকেও টেনে বের করে আনেন। গানের কবিতায় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি সজোরে তথাকথিত ‘অপশব্দে’র ব্যবহারেও দ্বিধা করেন না। যে বিদ্রোহ প্রচণ্ড গতিবেগে ঢুকে পড়েছে গানের কবিতায় তা লক্ষণীয়। কখনও এক প্রচণ্ড ধিক্কারযুক্ত ভালবাসায় রূপম ভেঙে দিতে চান সমস্ত সামাজিক ট্যাবুকে। যে গান আজকের মুহূর্তকে ধরবার গান। চিরকালের গানের দিকে ক্রমশ বয়ে চলেন কলকাতার এই অরফিউস। শিল্পীর একান্ত গভীর গোপন, নিজের কাছে সৎ, সৃষ্টিশীল সত্তাকে আগলে রাখতে পারেন একমাত্র এবং একমাত্র শিল্পী নিজেই। অত্যন্ত সচেতনভাবে, সন্তর্পণে। রূপমের সে চেষ্টা সার্থক একথা বলাই যায়। প্রকাশিত হল ‘কবিগায়ক’ রূপমের ‘গান সমগ্র ২’। অনবদ্য এই অর্ঘ্য নতুন প্রজন্মের কাছে এক আবিষ্কার।
"রূপম ইসলাম (জন্ম: ২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৪) হলয় বাঙালি গায়ক, সুরকার, গীতিকার ও লেখক। তিনি বিখ্যাত বাংলা রক্ ব্যান্ড ফসিলস্-এর প্রধান কন্ঠ শিল্পী। তিনি মূলত তাঁর সোলো অ্যালবাম এবং ফসিল্স-এর অ্যালবাম দ্বারা বিপুল খ্যাতি লাভ করেছেন। এছাড়াও তিনি বহু বাংলা ছবি-তে নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক এবং গীতিকার হিসেবে কাজ করেছেন। দুটো হিন্দি ছবি এবং একটি তেলুগু ছবিতে তিনি গান গেয়েছেন। বিভিন্ন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিজ্ঞাপনের জন্যেও তাঁকে গান গাইতে শোনা গেছে। ২০১০ সালে বাংলা ছবি মহানগর@কলকাতা-তে নেপথ্য গায়ক হিসেবে তিনি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন। প্রাথমিক জীবন ১৯৭৪ সালের ২৫ জানুয়ারি, নুরুল ইসলাম এবং ছন্দিতা ইসলামের একমাত্র সন্তান রূপমের জন্ম। তিনি তাঁর বাবা-মা পরিচালিত ঝংকার শিল্পী গোষ্ঠির অনুষ্ঠানে প্রথমবার মঞ্চে সঙ্গীত পরিবেশন করেন; তখন তাঁর বয়স মাত্র চার। মাত্র ছয়-সাত বছর বয়সে অন্নদাশঙ্কর রায়-এর একটি ছড়ায় প্রথমবার সুর সংযোজনা করেন, এবং সে গান বিভিন্ন সঙ্গীতানুষ্ঠানে গাইতে শুরু করেন। এমনকি আট বছর বয়স থেকে আকাশবাণী এবং দূরদর্শন-এও নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে থাকেন। কলকাতার আশুতোষ কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক করেন রূপম। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধীনে বিএড শেষ করে টাকি বয়েজ স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সঙ্গীত শিক্ষকতার পাশাপাশি সঙ্গীতচর্চা চলতে থাকে রূপমের।[৪] ফসিল্স তৈরি হবার আগেও বিভিন্ন ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন তিনি। যেমন 'রিদিম', 'রিদমিক', 'হরিদাসের ডানা' এবং 'দূরের গাংচিল। দুর্ভাগ্যবশত, সে ব্যান্ডগুলি চিরস্থায়ী হতে পারেনি। ১৯৯৮ সালে রূপমের প্রথম সোলো অ্যালবাম 'তোর ভরসাতে' এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয়, তবে তা বাণিজ্যিকভাবে অসফল থেকে যায়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে সে অ্যালবামটি 'নীল রং ছিল ভীষণ প্রিয়' নামে পুনঃপ্রকাশিত হয় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৮ সালে ফসিল্স-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০০২ সালে তাঁদের প্রথম অ্যালবাম 'ফসিল্স' আশা অডিও থেকে প্রকাশিত হয়। ব্যক্তিগত জীবন ২০০৩ সালে রূপমের সাক্ষাত হয় রূপসা দাসগুপ্তের সাথে। রূপসা তখন ফসিল্স সহ চারটে ব্যান্ডকে নিয়ে একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ডের জন্য অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় কর্মরত ছিলেন। সেই সূত্রেই তাঁদের আলাপ হয়। পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরী হয়, এবং বন্ধুত্ব থেকেই প্রেমের সূত্রপাত। ২০০৭ সালের ২১ অক্টোবর তাঁদের বিবাহ হয়, এবং ঠিক তার তিন বছর পর, অর্থাৎ ২০১০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তাঁদের সন্তান রূপ আরোহণ প্রমিথিউসের জন্ম হয়।"