মখমলে ঢাকা এত সুন্দর কারুকার্য করা চকচকে ড্রয়িং রুমে এর আগে আদনান কখনও ঢোকেনি। ঢুকেই একটা ছোপায় আরাম করে বসে পড়ে। বসে পায়ের উপর পা তুলে একটা পা নাচাতে থাকে। ছোপায় বসে যার অপেক্ষা করছে তাকে কোনোদিন সে দেখেনি। কিন্তু রুমে ঢুকেই ষাট ঊর্ধ্ব লোকটা যখন একটা সুন্দরী মেয়ের ছবি আদনানের দিকে বাড়িয়ে ধরে কথা বলতে শুরু করে তখন সে বুঝে নেয় তার কাছেই আদনান এসেছে।
আদনান কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ে ছবির মেয়েটার প্রতি। তারপর সে নিজেকে সামলে নেয়। কোনো মেয়ের প্রতি দুর্বলতা তার পেশার সাথে মানায় না। সুন্দর মুখের যেকোনো নারীর ছবি দেখলে যেমন পুরুষের হৃদয় একটু ছলকে ওঠে সেরকমই হলো তার। এর বেশি কিছু আদনানের হয়নি। কিন্তু ছবিটাকে ভালো করে দেখতে গিয়ে তার ভ্রূ একটু কুঁচকে ওঠে। এমন সুন্দর মেয়েটাকে পৃথিবী থেকে সরানোর দরকার পড়ছে কেন? ভাবতে গিয়েও থেমে যায়। তার ভাবনার বিষয় এটা না। তার ভাবনার বিষয় হল এই কাজের বিনিময়ে কত টাকা সে পাচ্ছে। কোথায় যেন মেয়েটাকে দেখেছে এরকম মনে হয় তার। একটু অন্যমনস্ক দেখায় তাকে। ছবিটা থেকে চোখ সরিয়ে নেয় আদনান। তারপর নিজেকে এই বলে বোঝায়, সব সুন্দরী মেয়েকেই চেনা চেনা লাগে।
মুহূর্তেই নিজেকে গুছিয়ে নেয় আদনান। ছবি ছেড়ে সে হাসান চৌধুরীর দিকে তাকায়। হাসান চৌধুরী তাকে জিজ্ঞাসা করে, মেয়েটাকে চিনতে পারছো?
না, মাথা নেড়ে উত্তর দেয় আদনান।
কয়েকটা সিনেমা করেছে। মোটামুটি ভালোই নাম করেছে। তোমার চিনতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। খুব পরিচিতের ভঙ্গিতে শান্ত স্বরে কথাটা বলে হাসান চৌধুরী।
টার্গেট ঠিক হয়ে গেলে আমি নিজেই খুঁজে নিতে পারি, পলকহীন চোখে কথা বলে আদনান। আর আমার রেট তো আপনি জানেন। মিনিমাম ফি পঁচিশ লক্ষ টাকা। টার্গেট ঝুঁকিপূর্ণ হলে ঝুঁকি বুঝে ফি নির্ধারণ হয়। আপনি যদি রাজি থাকেন তবে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। অন্যথায় আলোচনা এখানেই সমাপ্ত, কর্তৃত্বের স্বরে কথা বলে আদনান।
তারপর নায়িকা নিপা খুন হয়ে যায়। হাসান চৌধুরী একজন নামকরা ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। তার টাকায় পার্টি চলে। তার কথায় আইন। তার কি কিছুই হবে না! কথায় বলে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। আদনান আর হাসান চৌধুরীর কি হলো জানতে হলে বইয়ের শেষ পর্যন্ত যেতে হবে।
আশিকুজ্জামান এম.কে. গল্প বলার চেয়ে দেখার ওপর জোর দেন। মানুষ, সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতাকে তিনি কাহিনিতে বাঁধেন না; বরং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের ভেতরের গঠন বোঝার চেষ্টা করেন। তাঁর লেখায় আবেগ থাকে, তবে তার সংযত প্রকাশের চেয়ে উপলব্ধি গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানমনস্ক ভাবনা তাঁর কাজকে প্রভাবিত করে। কারণ ও ফলের সম্পর্ক, মানসিক বিকাশের ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবতার সীমা তিনি এড়িয়ে যান না। কল্পনা ব্যবহৃত হয়, কিন্তু তা যুক্তির ভেতরেই অবস্থান করে।
তিনি চিন্তাকে গ্রহণ করেন উৎস থেকে ভাঙা অনুভূতি বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থেকে নয়। সময়, সমাজ এবং মানুষের অবস্থানকে তিনি বৃহৎ প্রেক্ষিতে দেখেন, যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও একটি সামগ্রিক কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। এই দৃষ্টিই তাঁর লেখাকে স্থায়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলে।
তিনি পাঠককে আগে ভাবতে শেখাতে চান, তারপর অনুভব করতে। শব্দ তাঁর কাছে প্রদর্শনের মাধ্যম নয় চিন্তাকে স্পষ্ট করার একটি পরিমিত উপায়।