অধ্যাপক ভগিরথ দাস দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের ভাষা, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য নিয়ে শেকড়সন্ধানী গবেষণায় নিয়োজিত। তাঁর গ্রন্থ ‘ভাওয়াইয়ার কথা কথার ভাওয়াইয়া’ বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তরবঙ্গের ভূমিপুত্রদের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এপার বাংলায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা, আর ওপার বাংলায় রাজবংশী বা কামতাপুরী ভাষা, যে ভাষাকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াইয়া, জারি, কুশান, পালাগানসহ নানা লোকসংগীত ও নাট্যধারার সূচনা। লেখক সেই ভাষা, গান ও সংস্কৃতির শিকড়ের সন্ধানে নানা তত্ব ও তথ্য তুলে ধরেছেন এ বইয়ে।
যেখানে উত্তরবঙ্গের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কাজ থাকলেও সামগ্রিক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বোঝার জন্য নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের সংখ্যাও সীমিত। সেই দিক থেকে ভগিরথ দাসের “ভাওয়াইয়ার কথা কথার ভাওয়াইয়া” উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতি গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
গ্রন্থটির প্রথম ভাগে ভাওয়াইয়া সংগীত ও এর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। যেখানে ভাওয়াইয়ার উৎস, বিকাশ, সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি ভাওয়াইয়া সংগীতের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও আলোচনা করেছেন। এ অংশে দোতরা, দেশি ঢোল, সারিঞ্জা বা সারিন্দার মতো লোকবাদ্য ও সংগীত সাধনা এবং ভাওয়াইয়া সংস্কৃতির সঙ্গে কুশান নাট্যের সম্পর্ক নিয়েও তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেছেন।
দ্বিতীয় ভাগে উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর সমাজ-সংস্কৃতির নানা দিক উঠে এসেছে। কামরূপ-কামতা অঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাভা জনজাতির সংস্কৃতি, বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ বসতির স্মৃতি এবং রাজবংশী সমাজের লোকবিশ্বাস, ধর্ম, মাশান দেবতা এখানে আলোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে চিলারায়ের প্রসঙ্গ, আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্যচর্চার সম্ভাবনা, রাজবংশী গল্পকথা এবং রাজবংশী অভিধান প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার দিকেও লেখক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, “ভাওয়াইয়ার কথা কথার ভাওয়াইয়া” উত্তরবঙ্গের ভাষা, সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও লোকজীবনের বহুমাত্রিক গবেষণাধর্মী গ্রন্থ।
অধ্যাপক ভগিরথ দাস উত্তরবঙ্গের ভাষা, সংস্কৃতি ও লোক জীবনের এক নিবেদিত সাধক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি উত্তরবঙ্গের লোকমানুষের জীবনধারা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নিবিড় অন্বেষণের মাধ্যমে সাহিত্য ও গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরছেন। তাঁর গবেষণালব্ধ বহু গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি কলকাতার বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ হয়েছে, যা উত্তরবঙ্গের ভাষা, বিশেষ করে ভাওয়াইয়া গান ও লোকঐতিহ্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
ভারতের উত্তরবঙ্গের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখক হিসেবে তাঁর সৃজনশীলতা ও গবেষণাধর্মী কাজ বিশেষভাবে সমাদৃত। ভাওয়াইয়া গান, কবিতা ও লোকসাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অসংখ্য রচনা পাঠকসমাজে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
বর্তমানে তিনি ভারতের কোচবিহার শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি এবং উত্তরবঙ্গের লোকমানুষের জীবনজগৎ নিয়ে গবেষণা তাঁর জীবনের অন্যতম নেশা ও সাধনা।
ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রচারবিমুখ। বইয়ে নিজের পরিচিতি প্রকাশে অনাগ্রহী হওয়ায় তাঁর জীবনের বহু উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের কথা প্রকাশ করা সম্ভব হলো না। তাঁর নীরব সাধনা ও সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞ উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির ধারাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।