‘নূরনবী’ হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর শিশু কিশোরদের পাঠ্য জীবনী। শিশু-কিশোরদের উপযোগী জীবন কথা রচনার এই পদ্ধতি বাংলা ভাষায় সম্ভবত এই প্রথম। মহানবীকে রূপকথার রাজপুত্র হিসেবে কল্পনা করে অর্থাৎ শিশু-কিশোরদের মধ্যে ঠিক ঐ রকম মহৎ মানুষ হবার স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়ে এয়াকুব আলী চৌধুরী রচনা করেছেন ‘নূরনবী’ গ্রন্থটি। ‘নূরনবী’ যে কোনো শিশু-কিশোরকে অমল স্বপ্নে উদ্বল করে তোলে। এই গ্রন্থের সবচেয়ে বড়ো সার্থকতাই এখানে।’
‘নূরনবী’ গ্রন্থটি পাঠে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ‘নূরনবী’ সম্বন্ধে লিখেছিলেন-
‘নূরনবী’ পাঠ করিয়া আনন্দিত হইলাম। ইহার ভাষা সরল ও সুন্দর এবং ইহার বিষয় ও রচনা প্রাঞ্জল। শিশু পাঠকের পক্ষে মনোরম। এই রূপ সহজ- বাংলায় লেখা কঠিন কাজ। আপনি তাহাতে সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন।’
আর ‘ঠাকুমার ঝুলি’র লেখক দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ‘নূরনবী’ পড়ে লিখেছেন-
‘নূরনবী পাঠ করিয়া কি আনন্দ লাভ করিয়াছি তাহা বুঝান সহজ নয়। রূপকথার যে সুর ও ভাষা আপনি ইহাতে লইয়াছেন আজ দেশের ছেলেমেয়েদের বুকে বুকে আপনি সেই গান সত্য মনোরম করিয়া বাজাইয়া তুলিবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। মহাপুরুষের জীবনী এইরূপ করিয়া লিখিতে পারিলে যে কাজ করিতে পারা যায়, অন্যরূপে সেই প্রকার সিদ্ধিলাভের সম্ভাবনা বড় অল্প। ইহাতে শিশু-চিত্তের অভিজ্ঞতারই শুধু যে আপনি যথেষ্ঠ পরিচয় দিয়াছেন বা মাতৃভাষার জন্য সুধাপানে আপনার সুন্দর-ফসল-আকুলতা বিশেষরূপে প্রমাণ করিয়া পরিবেশন করিয়া দিয়াছেন তাহাই নয়, পরমামৃত কথায় আপনার মন যে, কতখানি মগ্ন তাহাও আপনার এই কাজটিতে গোপন থাকে নাই। এই রূপ অধিকারী না হইলে এমন করিয়া এ কাজ করিবার সরসতা আর কাহার হইতে পারে। যেমন ছেলেদের তেমন সকল দেশাবাসীরই মনে সঙ্গীতের সুর কথায় মাখিয়া দিয়া আপনি বাঙ্গালী অন্তরের অশেষ প্রীতির ও ধন্যবাদের ভাজন হইয়াছেন। আপনার ভাষার ঝরণার সজীব ধারায় আপনার এ স্বপনের সত্যের গান-এই আনন্দ ও আলোর গান-সত্যই মধুময় হইয়া সার্থক হইয়াছে।’
নূরনবী সম্পর্কে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বলেন-
“চৌধুরী এয়াকুব আলী ‘মানব মুকুট’-এ যে আদর্শ মহামানুষটিকে প্রচার করেছেন, তাঁকে তিনি দেশের ছোটদের সামনে ফুলের মতো সুন্দর ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘নূরবী’ বইটাতে। সমস্ত মানুষ সমাজকে অষুরিকতা থেকে দিব্য আলোক – উজ্জ্বল! জীবনে তিনি আহ্বান করেছিলেন। তিনি জানতেন; তাঁর এ নিমন্ত্রণকে সত্যিই সার্থক করতে হলে সংসারের কুটিল কাঠিন্যে জড়ীভূত চিত্তকে একমাত্র উদ্দেশ্য ভাবলে চলবে না। তাই তিনি শিশুদের নম্র, মধুর, নমনীয় এবং গ্রহণশীল মনের সামনে তাঁর বাণী, তাঁর আদর্শ, তাঁর আমন্ত্রণ এক অপূর্ব শতদলের সৌন্দর্যে মেলে ধরেছেন ‘নূরনবী’র অনুপম ভাষাচ্ছন্দে। আমার মনে হয় সমগ্র বাংলা সাহিত্যে ‘নূরনবী’র জোড়া মিলবে না।”
বিখ্যাত মনীষাদের এমন চমৎকার সব মন্তব্যেই ফুঁটে উঠেছে কালজয়ী গ্রন্থ হিসেবে নূরনবী‘র বিশালত্ব। আমরা আশাকরি সমকালের শিশু-কিশোরদের মাঝেও বইটি নবী মোস্তফা সা. এর জীবনচরিত হিসেবে চিরায়ত আলোড়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে।
মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী যিনি সচরাচর সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী নামে অভিহিত বাংলাভাষার একজন লেখক এবং সাংবাদিক। তিনি শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে পশ্চাৎপদ মুসলমানদের অগ্রগামী করেন। জন্ম রাজবাড়ী জেলার পাংশার মাগুরাডাঙ্গা গ্রামে ১৮ কার্তিক ১২৯৫-এ (১৮৮৮)। পিতা পুলিশ অফিসার এনায়েতুল্লাহ চৌধুরী। পাংশা হাইস্কুল থেকে এমই এবং রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেও বিএ ক্লাসে পড়ার সময় দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়ায় পড়ালেখা ছাড়তে বাধ্য হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে থাকতে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘কোহিনূর’ সম্পাদক রওশন আলী চৌধুরী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লে তিনি সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ।১৯১৪-১৫ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই থানার জোরওয়ারগঞ্জ হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর রাজবাড়ী সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশনে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২০-২১ খ্রিষ্টাব্দে পাংশা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার সময় অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের হাতে কারাদণ্ড ভোগ করেন। কারামুক্তির পর কলকাতায় যান এবং সাংবাদিকতায় যোগ দেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির (৪ সেপ্টেম্বর, ১৯১১) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এবং সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪টি। নূরনবী গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের প্রশংসাবাণী সংযোজিত হয়েছে। ধর্মের কাহিনী (১৯১৪), নূরনবী (১৯১৮), শান্তিধারা (১৯১৯), মানব মুকুট (১৯২২)। এছাড়া বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে এয়াকুব আলী চৌধুরী অপ্রকাশিত রচনা নামীয় একটি গ্রন্থ। এর সম্পাদক আমীনুর রহমান। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৪০ সালে ফরিদপুর অবস্থানকালে তার মৃত্যু হয়।