এবং সখী ও পাখি । একটি সামাজিক প্রেমের উপন্যাস। যাতে রয়েছে একটু রহস্যের আভাস। উপন্যাস টি যতো এগিয়েছে ততই ভালোলাগার একটা রেশ ছড়িয়ে পড়েছে। যার শেষ টা ভাবতে বাধ্য করবে এরকম হওয়াটাই কি উচিত ছিল নাকি একটু অন্য ভাবেও এর সমাপ্তি ঘটানো যেতো।
উত্তরবঙ্গের চটকপুরে ঘুরতে এসেছে ইভানা ও তার মা দিতি। ইভানা এখন মাস্টার্স করছে। কয়েক মাস আগেই ইভানা তার বাবাকে চিরকালের জন্যে হারিয়েছে। মায়ের সেই দুঃখ লাঘব করার জন্যেই একটু চেঞ্জে আসা দুজনের। সেখানেই একদিন ওয়াচটাওয়ারে তাদের দেখা হয়ে যায় এই সময়ের সিরিয়াল জগতের এক পরিচিত মুখ সুগত বাবুর সাথে, যিনি তার স্ত্রীর সাথে এসেছেন। কথায় কথায় ইভানা জানতে পারে এই সুগত বাবু তার মায়ের এক সময়ের চেনা। একই কলেজে সিনিয়র ও জুনিয়র ছিলেন। কিন্তু ইভানার মা দিতি হারিয়ে যায় সুগত'র সাথে কাটানো সেই দিন গুলোতে। যেখানে তাদের প্রেম এমনকি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল দিতির বাবার অমতে। তারা ঠিক করেছিলো বিয়ে করবে দিতির বাড়ির কাউকে না জানিয়ে রেজিস্ট্রি করে। কিন্তু সেই বিয়ের দিনটা দিতির বাবা যেনো কিভাবে জানতে পেরে যান ও সেই দিনই দিতিকে সারাদিন ঘরে বন্দি করে রাখেন। ফলে বিয়ে হয় না, এভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে সুগত বেশ কয়েক মাস বেপাত্তা হয়ে যায় ও অবশেষে অর্পিতা নামে একজন কে বিয়ে করে।
দিতি ও সুগত দুজন একে অপরকে আবার সামনে দেখে একটু আবেগী হয়ে পড়ে। যদিও সবার সামনে তারা পুরোনো বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেয়। ঠিক হয় দুই পরিবার একইসাথে এখানে কিছুদিন কাটাবে ও ঘুরবে। সুগত'র স্ত্রী অর্পিতাও এতে সায় দেয়। ইভানা ইতিমধ্যে লক্ষ্য করে তার মা'র হাসি কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে। সে তাই মায়ের কাছ থেকে তাদের অতীতের সম্পর্কের ব্যাপারে জানতে চায়। মায়ের কাছ থেকে তাদের বিয়ে ভাঙার গল্প শুনে ইভানার মনে একটু হলেও সন্দেহ জাগে। এই বিয়ে ভাঙা হয়েছে কোনো ষড়যন্ত্র করে। কেউ না জানালে তার দাদু বিয়ের তারিখ কি করে জানবে, এই নিয়ে সে ফোনে ফোনে একটু খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে তার দাদু ও সে সময়ের মায়ের এক বান্ধবীর কাছে। ইতিমধ্যে সৌরিকের সাথে আলাপ হয় ইভানার, যে সুগত ও অর্পিতার ছেলে। সে হঠাৎ করেই এসেছে মা, বাবার কাছে। এবং দুজনের পরিবারের পরিচয় জানবার আগেই তারা একে অপরকে এক আলাপে পছন্দ করতে শুরু করেছে। এবারে এই দুজনের সম্পর্ক কোন খাতে এগোবে? ইভানা কি পারবে তার মায়ের এই বিয়ে ভাঙার পেছনে কার মাথা ছিল বের করতে? এই নিয়েই উপন্যাস টি এগোতে থাকে। যার শেষ টা এভাবে হবে আশা করিনি। আবার মনে হয়েছে এভাবেই শেষ করে ভালো করেছেন লেখক।
স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই উপন্যাস টি পড়তে গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও চটকপুরের প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিবরণ খুব ভালো লেগেছে। মা ও মেয়ের সম্পর্ককে এখানে দুই বন্ধুর মতোন। সাথে এখানে বিয়ে করার আগে যে মেডিকেল টেস্ট করানো উচিত সেটাও দেখিয়েছেন লেখক, যা একান্তই প্রয়োজন। উপন্যাসের ধারাবাহিকতা খুব সুন্দর, একের পর এক ঘটনা গুলি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। শেষে ইভানার মনের দোলাচল ও সিদ্ধান্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ এই উপন্যাসের। এই উপন্যাসে সম্পর্কের অনেক জটিলতা নেই, ইভানা ও সৌরিকের প্রথম আলাপের অংশটি বেশ ভালো লেগেছে। পুরো উপন্যাসে এক অজানা পাখির ডাকে ইভানার মনে প্রেম প্রেম ভাব এসেছে। ইভানা কি সত্যি এবারে প্রেমে পড়বে? এক বেলাতে শেষ করার মতোন একটি দারুণ উপন্যাস।
সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ২১ জানুয়ারি ১৯৬১, হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। অদ্যাবধি উত্তরপাড়ার পৈতৃক বাড়িতে বসবাস। পিতা সাহিত্যসেবী। লেখা শুরু আঠারো-উনিশ বছর বয়সে। সে সময় দু-তিনটি গল্প স্থানীয় লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। তারপর দীর্ঘ বিরতি। বারো বছর পর (১৯৯৪) আবার একটি গল্প লিখে সরাসরি দেশ পত্রিকায় পাঠিয়ে দেন। একসারি নবীন গল্পকারদের সঙ্গে গল্পটি ছাপা হয়। পরিচয় হয় বিরাট পাঠককুলের সঙ্গে। বিগত চার বছর ধরে নামী-অনামী বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখে যাচ্ছেন। প্রথাগত শিক্ষা স্নাতক পর্যন্ত। এ ছাড়া ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা। অল্পবয়স থেকে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থেকেছেন। এখন একটি ফটোপ্রিন্টিং সংস্থায় কর্মরত। প্রথম উপন্যাস ‘প্রত্নকন্যা'। মল্লারপুর’ ১৯৯৯ সালের স্নোসেম-আনন্দ দুর্গোৎসব অর্ঘ্য-এ শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে পুরস্কৃত হয়। এ ছাড়াও ১৯৯৭ সালে পেয়েছেন গল্পমেলা পুরস্কার।