ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনযাপন, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহক। একই ভাষার ভেতরেও অঞ্চলভেদে উচ্চারণ, শব্দ, অর্থ ও বাক্যরীতির যে বৈচিত্র্য গড়ে ওঠে, সেটিই লোকভাষা বা আঞ্চলিক ভাষার স্বাতন্ত্র্য। এই বৈচিত্র্যই বাংলা ভাষাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ, প্রাণবন্ত ও বহুরূপী।
বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য ভাতকে নরসিংদীর মানুষ 'ভাত'ই বলে। কিন্তু যে চুলায় হাড়ি-পাতিল চড়িয়ে ভাত রান্না করা হয়, সেই পাতিলকে তারা বলে 'পাইলা' এবং চুলাকে বলে 'পাহাল'। নরসিংদীর লোকভাষায় ধ্বনিগত কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে 'স' ও 'শ'-এর পরিবর্তে 'হ' ধ্বনির ব্যবহার, আবার 'র'-এর স্থলে 'ল' ধ্বনির উচ্চারণ এই অঞ্চলের ভাষাকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। তাই 'রায়পুরা' হয়ে যায় 'লাইপুরা', 'নরসিংদী' উচ্চারিত হয় 'নোসন্দি', আর 'রেললাইন' হয়ে ওঠে 'লেললাইন'। একইভাবে সকালকে 'বেইন্নালা', বিকালকে 'বাইট্যালা', শ্বশুরকে 'হউর', শাশুড়িকে 'হরি', গরমকে 'ততা', টককে 'চুক্কা', পাটখেতকে 'নাইল্যাখেত' কিংবা বড়ো মানুষকে 'বুইত্যামারা' বলার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে এ অঞ্চলের নিজস্ব ভাষাগত ঐতিহ্য।
এই ধরনের শব্দ কেবল শব্দ নয়; এগুলো একটি সমাজের স্মৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক, কৃষিভিত্তিক জীবন, লোকাচার, বিশ্বাস এবং শত বছরের ভাষাগত বিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। প্রতিটি আঞ্চলিক শব্দের পেছনে রয়েছে মানুষের জীবনসংগ্রাম, পরিবেশ, পেশা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের ছাপ। তাই লোকভাষা সংরক্ষণ মানে শুধু শব্দ সংরক্ষণ নয়; বরং একটি অঞ্চলের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
বর্তমান সময়ে নগরায়ণ, প্রযুক্তির বিস্তার, গণমাধ্যমের প্রভাব এবং প্রমিত ভাষার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডারকে দ্রুত বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক শব্দ আজ আর নতুন প্রজন্মের মুখে শোনা যায় না; প্রবীণদের স্মৃতিতেই সেগুলো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে অমূল্য ভাষাগত সম্পদ। এই বাস্তবতায় নরসিংদীর আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং দলিলবদ্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।
'নরসিংদীর আঞ্চলিক শব্দকোষ' সেই দায়িত্ববোধ থেকেই প্রণীত একটি প্রয়াস। এই গ্রন্থে নরসিংদীর বিভিন্ন উপজেলা, গ্রাম ও জনপদে প্রচলিত বহু আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহ করে তাদের প্রমিত বাংলা অর্থ, প্রয়োগ, উচ্চারণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবহারিক উদাহরণ সংযোজনের চেষ্টা করা হয়েছে। শব্দগুলোর অনেকগুলো আজও দৈনন্দিন কথ্যভাষায় ব্যবহৃত হলেও, কিছু শব্দ ধীরে ধীরে বিস্মৃতির পথে। এই গ্রন্থ সেই হারিয়ে যেতে বসা ভাষাসম্ভারকে লিপিবদ্ধ করে রাখার একটি আন্তরিক প্রয়াস।
শব্দকোষটি শুধু ভাষাবিদ বা গবেষকদের জন্য নয়; শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, সাংবাদিক, নাট্যকার, লোকসংস্কৃতি গবেষক এবং নরসিংদীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যে আগ্রহী সব পাঠকের জন্য সমানভাবে উপযোগী। একই সঙ্গে যারা নিজেদের শেকড়, পারিবারিক ভাষা কিংবা পূর্বপুরুষের কথ্যভাষাকে নতুন করে জানতে চান, তাঁদের জন্যও এটি একটি মূল্যবান সহায়ক গ্রন্থ।