স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল আন্দোলন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী দিনাজপুর জেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর পরও এ গৌরবময় অবদানের গ্রহণযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থিত করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধের প্রান্তিক ইতিহাস সঙ্কলনে দায়বদ্ধতার অভাব; দ্বিতীয়ত, সংগৃহীত দলিলপত্র বা তথ্যের অভাব, যা স্থানীয় ইতিহাস রচনার প্রধান অন্তরায়। এ বিষয়ে যথার্থ ক্ষেত্র ও সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত পর্যায়ে উত্তর প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক অবদানকে তুলে ধরার জন্য এটি একটি প্রচেষ্টা। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত দিনাজপুরবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ ও স্বাধীনতা পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসংরক্ষণ প্রচেষ্টার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এ গ্রন্থে সঙ্কলিত হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে অবশ্যই বৃহৎ পরিসরে দিনাজপুরের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক অবদানের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গের পথে এগিয়ে যাবে এ বিষয়ে আমরা আশান্বিত। এভাবে একদিন স্থানীয় ইতিহাসই জাতীয় ইতিহাসের পরিপূরক হয়ে কালের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু জাতির কাছে দিনাজপুরের বিস্মৃত তথ্যসম্পদই প্রতিনিধিত্ব করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস। দেশবিভাজন পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামে বৃহত্তর দিনাজপুর (ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) ছিল পাকিস্তান সরকারের স্বৈরাচারী শাসনবিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম সাংগঠনিক ক্ষেত্রভ‚মি। বিশেষ করে বৈদেশিক বেনিয়াদের শাসন-শোষণ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পরাধীনতা থেকে এ অঞ্চলের অধিকারবঞ্চিত সংগ্রামী জনতা মুক্তির আকাক্সক্ষায় উন্মুখ ছিলেন। সুদীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানি অপশাসন, নিপীড়ন, বৈষম্য ও অগণতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের আশাহত বাঙালিরা তাদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে ঘুরে দাঁড়ায়। আলোচ্য গ্রন্থটি পাঠক ও বোদ্ধামহলে ব্যাপক পঠিত, সমালোচিত ও আলোচিত হবে এ প্রত্যাশা রইল।
স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধ্যানী গবেষক মোজাম্মেল বিশ্বাসের জন্ম ১৫ ডিসেম্বর ১৯৬৬। পিতা তোফাজ্জল হোসেন, মাতা জবেদা খাতুন। তিনি চেরাডাঙ্গী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক, দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৮৭ সালে স্নাতক ও ১৯৮৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে চিলাহাটি সরকারি কলেজ, নীলফামারী ও ১৯৯৭ সাল থেকে দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দিনাজপুর সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে পরবর্তীতে আবার তিনি ২০২৪ সালের নভেম্বরে দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু ২০২৫ এর এপ্রিলে তিনি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অধ্যক্ষ পদে বদলী হয়ে বর্তমানে কর্মরত বোনার পাড়া সরকারি কলেজ, গাইবান্ধা।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার সাথে সম্পৃক্ত। প্রকাশিত গ্রন্থ- আঁধার পোড়ানো কোরাস, শেকড়গুচ্ছের সবুজ ভ্রমণ, হৃদয়ঘাটে প্রেম যমুনার পদ্ম, অন্তরলোকে অন্য মানুষ, শীতরোদে কাকদৃশ্য, ঘরহীন ঘোরে এ কোন মায়ার সংসার, দিনাজপুরে ভাষা-আন্দোলন, দুন্দুভি, সম্পা. সঙ্কলন, ২০০০, অগ্নিসেতু, সম্পা. সঙ্কলন, ২০১২, অগ্নিসেতু, সম্পা. সঙ্কলন, ২০১৪, দিনাজপুর জেলা গেজেটিয়ার, সম্পা. গবেষণা, ২০১৪। গবেষণা গ্রন্থ : গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জেলা জরিপ : দিনাজপুর, দিনাজপুরের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ, জিন্দাপীর গণহত্যা। সংসারসঙ্গী সালেহা খাতুন লতা এবং সন্তান মনীষা হক, মহিমা হক ও সৌমিক হক নিয়ে তাঁর ঘর-সংসার।