5 verified Rokomari customers added this product in their favourite lists
TK. 600TK. 480 You Save TK. 120 (20%)
আমার জীবনের যে দুঃসহ কষ্ট, যার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল সেই উনিশশ একাত্তর সালের তেরোই মে। সেই কষ্ট-বীজ আজ বিষাদের পাখা মেলে আকাশ ছুঁতে চাচ্ছে। আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি নীলকণ্ঠী বিষাদময় প্রস্
#একটি_শব্দশৈলী_প্রকাশনা
#বুক_রিভিউ
📘 একাত্তরের জননী
রমা চৌধুরী
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিড়ের মাঝে কিছু মানুষ আছেন—যারা আলোয় আসেন না, কিন্তু তাদের কণ্ঠে থাকে এক জাতির না-বলা কান্না। রমা চৌধুরী সেই নীরবতার নাম; সেই অশ্রুর আর্তনাদ, যা দশকের পর দশক ধরে অদৃশ্য আগুনের মতো দগ্ধ করেছে। তার লেখা “একাত্তরের জননী” ঠিক তেমনই এক গ্রন্থ—যেখানে ইতিহাস মুখোমুখি দাঁড়ায় মানবিক করুণার সবচেয়ে নির্মম রূপের সামনে।
১৯৭১ সালের ১৩ মে রমা চৌধুরীর জীবনের আকাশ ভেঙে পড়েছিল। নির্যাতনের সেই রাত, সেই ভোর, সেই দীর্ঘ নিঃশব্দতা—সবকিছু তিনি এই বইয়ে তুলে ধরেছেন এক অদ্ভুত সাহসিকতায়। কোনো মুখোশ নেই, কোনো অলংকার নেই; যেন প্রতিটি বাক্য রক্তাক্ত সত্যের দহন থেকে উঠে এসেছে। তার লেখা শব্দগুলো পড়ে মনে হয়—যেন একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, যেন শোকের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একাকী নারীর দীর্ঘশ্বাস, যেন স্বাধীনতার মূল্যে নত না হওয়া এক অবিনাশী আত্মা।
তবে রমা চৌধুরীর কাহিনির সৌন্দর্য শুধু ব্যথায় নয়—অদম্যতায়ও। যুদ্ধোত্তর জীবন ছিল তার জন্য আরও কঠিন এক যাত্রা—পোড়া ঘর, নিঃস্ব জীবন, একের পর এক সন্তান হারানোর বেদনা, আর সমাজের অচেনা নিষ্ঠুর মুখের ঠান্ডা ব্যঙ্গ।
তবুও তিনি থামেননি। এক হাতে বই লিখেছেন, অন্য হাতে সেই বই বিক্রি করে বেঁচে থেকেছেন। রমা চৌধুরী এসব অভিজ্ঞতাকে দুঃখ দিয়ে নয়—বরং এক অদ্ভুত মর্যাদায়, গভীর স্বচ্ছতায়, যেখানে ব্যথা আছে, তবুও আছে আলো, সেইভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি নিজ সন্তানের কবরের মাটির উপর দিয়ে স্যান্ডেল পড়ে হাঁটতে পারবেন না—এই কারণে সারাজীবন খালি পায়ে হেঁটেছেন। এ যেন যন্ত্রণা নয়, মমতার অতল গভীরতার এক অনুপম প্রতীক।
রমা চৌধুরীকে পড়তে পড়তে মনে হয়—মানুষের শরীর যত ক্ষত বহন করতে পারে, তার আত্মা তার চেয়েও অনেক বেশি সহ্য করতে পারে।
“একাত্তরের জননী” কেন আজও এত জরুরি?
কারণ এটি ইতিহাসের এক নির্লজ্জ ভূগোল-যেখানে চোখ ফিরিয়ে থাকা যায় না। নারীর ওপর যুদ্ধের নির্মমতার যে অধ্যায় দীর্ঘদিন অন্ধকারে ছিল, এই বই তা আলোয় আনে।
কারণ এটি কেবল একজন নারীর গল্প নয়—এক জাতির বিবেকের গল্প। যে জাতি স্বাধীনতার গান গায়, তাকে অবশ্যই এই বই পড়তে হবে- স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য বুঝতে।
কারণ এটি কাঁদায়, আবার শক্তিও দেয়। বইটি পড়ার পর মনে হয়—কত অদম্য শক্তি লুকিয়ে আছে একজন মানুষের ভেতরে!
কারণ এটি সত্যের পাঠশালা। এই বই এমন এক স্মৃতিকথা, যা আমাদের শেখায়—ইতিহাস শুধু বিজয়ের নয়, বেদনারও উত্তরাধিকার।
বইটির প্রতিটি শব্দ যেন গভীর রাতের নিঃশব্দে শোনা কোনো মায়ের কান্না। প্রতিটি বাক্য যেন অশ্রুভেজা স্মৃতির ওপরে রাখা নরম হাত। আর প্রতিটি অধ্যায় পাঠককে আবদ্ধ করে ফেলে এক গভীর মানবিক টানে। পড়তে পড়তে মনে হয়—
এই বই শুধু রমা চৌধুরীর নয়, এটি বাংলার প্রতিটি বীরাঙ্গনার, প্রতিটি মায়ের, প্রতিটি নীরব ক্ষতবিক্ষত নারীর গল্প।
“একাত্তরের জননী” শব্দশৈলীর একটি অমূল্য প্রকাশনা। যারা সত্যিকারের মুক্তিযুদ্ধ পড়তে চান,
মানবিকতার আলোকে ইতিহাসকে ছুঁতে চান, এ বইটি তাদের সংগ্রহে থাকা আবশ্যক।
যে বই পড়লে মানুষ আরও মানুষ হয়ে ওঠে—
এ বইটি নিঃসন্দেহে তাদের প্রথম সারির একটি।