”বাংলার কৃষক”
- সাদাত উল্লাহ খান
কৃষি মানব-জাতির একটি আদিম পেশা ৷ নব্য প্রস্তর-যুগের মাঝামাঝিতে কৃষির উদ্ভব ৷ এই যুগ টিকেছিল হাজার দশেক বছর ৷ তখন মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছে ৷ দশবিশ মিলে পাহাড়-জঙ্গলে প্রস্তর যুগের মতোই শিকার করে জীবিকা অর্জন করলেও, শিকারের যন্ত্রপাতির উৎকর্ষ ঘটেছে, অস্ত্রশস্ত্রের আকার-প্রকারও বদলেছে ৷ এক কথায় বলতে গেলে তাদের কারিগরি প্রতিভা খানিকটা তীক্ষ্ন হয়ে উঠেছে ৷ ঠিক সেই সময়েই প্রায় পাঁচ-সাত হাজার বছর পূর্বে, বর্বর মানুষ পেশা হিসেবে কৃষিকে আস্তে আস্তে গ্রহণ ও আয়ত্ত করতে শুরু করে ৷ মানব জাতির ইতিহাসে সে এক বৈপ্লবিক ঘটনা ৷ মানব সভ্যতা প্রথম পৈঠায় পা বাড়ালো ৷ এগ্রিকালচার তথা কৃষিকে ভিত্তি করে মানব সভ্যতা গড়ে ওঠে বলেই সভ্যতার পরিভাষায় কালচার বা কৃষ্টিরূপে গৃহীত হয় ৷বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে কৃষকের বাস। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই, প্রতিটি কৃষক লাঙ্গল কাধে নিয়ে মাঠ পানে ছুটতে থাকে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে ফসল ফলায়। ভোরবেলা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকে তার এই পরিশ্রম। এভাবেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে প্রতিটি কৃষক আমাদেরই জন্য উৎপাদন করে যাচ্ছে খাদ্য শস্য ও অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্য।বাংলাদেশের কৃষকের অতীত অবস্থা আমরা ইতিহাস, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচনের মধ্য দিয়েই বুঝতে পারি। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশের কৃষকদের কথা স্থান পেয়েছে। এদেশের কৃষকের এক সময় ছিল গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ। সেই সাথে কৃষাণীর পরনে থাকত তাঁতের শাড়ী আর নানা রকম অলংকার। অতীতে বাংলাদেশের লোক সংখ্যা ছিল কম, সেই তুলনায় চাষযোগ্য জমি ছিল বেশি, সাথে ছিল উর্বর জমি, সেই কারণে ফসল ফলত অধিক। কিন্তু বর্তমানে এদেশে আর সেই অবস্থা নেই। এখন দরিদ্র, শিক্ষাহীন, অসহায় কৃষক তার কষ্টের ন্যায্য মূল্য আর পায় না। তবে বর্তমানের কৃষকরা মান্ধাতার আমলের কুপমন্ডকতা ও কুসংস্কার থেকে বেরিয়েছে। তাই তার নিজেদের উন্নয়নের চেষ্টা করে চলেছে অবিরাম।বাংলাদেশের কৃষিখাত নানা সমস্যায় জর্জরিত, যার ভুক্তভোগী হচ্ছে এদেশের কৃষকরা। এসব সমস্যা অতিক্রম করে কৃষি কাজ চালিয়ে যেতে তাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নিম্নে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের কিছু প্রধান সমস্যা তুলে ধরা হলো।বর্তমানে দেশের অধিকাংশ কৃষকই গরীব ফলে তারা প্রায়ই কাজ করতে গিয়ে মূলধন সংকটে পড়ছেন। ফলে সঠিক সময়ে মূলধনের অভাবে সঠিক কাজটি না করতে পেরে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।কৃষিতে ফলন বাড়ানোর জন্য দক্ষ কৃষকের বিকল্প নেই। আমাদের দেশের বেশিরভাগ কৃষকই অশিক্ষিত এবং অদক্ষ। এমনকি তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেই।এদেশের কৃষকরা এখনও পুরাতন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির অভাবে অনেক পিছিয়ে যাচ্ছেন।শুকনো মৌসুমে কৃষকরা ইরি ধান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সেচ দিতে পারেন না। ফলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অপরিসীম ভূমিকা রাখছে অথচ এদেশের কৃষকের অবস্থা এখনও নাজুক। তাদের সামাজিক মর্যাদা নেই বললেই চলে। এই জন্য শিক্ষিত নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো প্রয়োজন। যে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী শহরে বসে কৃষকের ভাগ্য নির্ধারণ করেন তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন। কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নে গৃহীত সময়োচিত পদক্ষেপই জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। তাই এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।