21 verified Rokomari customers added this product in their favourite lists
TK. 650TK. 582 You Save TK. 68 (11%)
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামের রাজনৈতিক ভূখণ্ডের অভ্যূদয়। বাংলাদেশকে বুঝতে, তার ভবিষ্যেক নির্মাণ করতে তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানা মাত্রাকে নিরন্তর সংরক্ষণ এবং বিশ্লেষণ প্
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড শুরু করে পাকিস্তানি সেনারা।
সেই রাতে এই নৃশংসতার বিপরীতে বাংগালি জাতির কিছু মানুষ রুখে দাঁড়ায়। এরা দুভাগে বিভক্ত। এক ভাগের কথা আমরা জানি, রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা। জাতি এদের চিরকালই গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে আসছে। কিন্তু আরেকভাগ বীরের কথা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও প্রায় অনুল্লেখ্যই থেকে গেছে।
তাঁরা হলেন সেই রাতে জীবনঝুঁকি নিয়ে প্রায় কোনো লজিস্টিকস ছাড়াই আহত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চিকিৎসাকর্মীরা।
যুদ্ধের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ এই পৃথিবীতে আর নেই। কারণ প্রাকৃতিক বা দুর্ঘটনাজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্ভয়ে সকলের সাহায্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু যুদ্ধের সময় সেটা হয় না। এসময় মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় চিকিৎসক সহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের।
১৯৭১ সালেও সেটাই হয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম রাত থেকেই শত্রুদের আক্রমনে মানুষ আহত হয়েছে, নিহত হয়েছে। ভারতে প্রায় ১ কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলো। ভয়াবহ সব মহামারী এবং অপুষ্টির শিকার হয়েছিলো তাঁরা।
অথচ তাঁদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য আমাদের চিকিৎসা প্রস্তুতি ছিলো প্রায় শূণ্য। তারপর ৯ মাস কেটেছে। আস্তে আস্তে গড়ে উঠেছে যুদ্ধকালীন চিকিৎসাসেবা। দেশি বিদেশি অসংখ্য মানুষের সহায়তায় এই চিকিৎসাসেবা বাঁচিয়েছে লাখো মানুষের প্রাণ।
পেশাজীবীদের মধ্যে একমাত্র চিকিৎসকদের একটা অংশই দুটো কাজ একসংগে করেছে। তাঁরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দিয়েছেন আবার সম্মুখ সমরেও অস্ত্রহাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
অথচ গত ৫০ বছরেও মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসা ইতিহাস নিয়ে পূর্নাঙ্গ উল্লেখযোগ্য কোনো গ্রন্থ লেখা হয়নি। এবারই প্রথম মেলায় এসেছে শাহাদুজ্জামান এবং খায়রুল ইসলাম লিখিত বই "মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস"।
অসাধারণ একটি বই। এই ফেসবুকের যুগেও বইটা পুরোটা একনাগাড়ে পড়ে ফেলেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসা সেবা গড়ে উঠার পটভূমির পাশাপাশি এইযুদ্ধের অনেক চমকপ্রদ কাহিনী এই বইতে লেখা আছে। শুধু গৎবাঁধা পরিসংখ্যান নয়, চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মী ছাড়াও যুদ্ধের অনেক বীরদের কৃতিত্বপূর্ণ সংগ্রামের কাহিনীও লেখা হয়েছে চমৎকারভাবে।
মুক্তিযুদ্ধের অনেকগুলো স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে। চিকিৎসাযুদ্ধ তেমন একটি। অথচ লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক চর্চার "পড়া কম, স্লোগান বেশি" নীতির আমাদের অধিকাংশ চিকিৎসক নেতারাও কখনো গৌরবময় এই অংশ নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না। তরুণ চিকিৎসকরা তাই রয়ে গেছেন একেবারেই আঁধারে।
কি চমৎকারভাবে অসংখ্য মানুষ তখন চিকিৎসা পেয়েছে। কলেরা মহামারীর হাত থেকে জীবন বেঁচেছে কয়েক মিলিয়ন মানুষের, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে কয়েক লাখ নারীর নিরাপদ গর্ভপাত হয়েছে, যুদ্ধের পর কয়েক মাসে গড়ে উঠা পংগু হাসপাতাল বিশ্বমানের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করেছে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে, সাধারণ পল্লী চিকিৎসক বা মেডিকেল ছাত্র অথবা একেবারে সাধারণ মানুষ কিভাবে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে বাঁচিয়েছে সামরিক বেসামরিক কোটি মানুষের প্রাণ সেগুলোর কাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্রযুদ্ধের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
সেই আমলে বিলেতের বাংগালি চিকিৎসকরা চাঁদা তুলে পাঠিয়েছেন প্রায় কোটি টাকা। ডাক্তার মবিন, ডাক্তার জাফরুল্লাহরা বিলেতের বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে বিনা বেতনে মাসের পর মাস চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন, অনুদান নিয়ে এসেছেন। ডা. টি হোসেন প্রবাসী সরকারের কার্যালয়ের বারান্দার এককক্ষে গড়ে তুলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গা শিউরে উঠবে এসব সংগ্রামের কথা জানলে।
অথচ এরপরও এদেশে একটা মেডিকেল কলেজের নামও মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসাসেবা দেয়া চিকিৎসকদের নামে হয়নি।
তরুণ চিকিৎসকদের, স্বাস্থকর্মীদের, নতুন প্রজন্মের সকলকে অনুরোধ জানাই, বইটি পড়ুন। পূর্বসূরীদের অসাধারণ আত্মত্যাগের কাহিনীতে অনুপ্রাণিত হোক আজকের প্রজন্ম।