কবি জীবনান্দের কাব্যের মূলসুর সৌন্দর্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনার স্ফূরণ। এই স্ফূরণ মূলত মঙ্গল ও কল্যাণের ব্রত। তার অভিষ্ট লক্ষ্য মূলত মঙ্গল ও কল্যাণÑ এটি করতে গিয়ে তিনি পৃথিবীর রক্তাক্ত ইতিহাস খনন করেছেন, সভ্যতার শরীর কেটে ছিঁড়ে, শাসক ও শোষকের শরীর ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়ে দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত আলোকিত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন। জীবনের প্রতি গভী আসক্তি শেষ পর্যন্ত তার কাব্যের অন্তিম আবেদন হয়েছে।
জীবনানন্দ দাশ পরাবাস্তব কবি। অনেকেই বলে থাকেন বাংলা কবিতাজগতে পরাবাস্তবতার যে উন্মেষ তা তাঁর হাত ধরেই। তিনি সুন্দর ও আলোকিত এক পৃথিবীর নির্মাণ করতে চেয়েছেন; যা বাস্তবে হয়তো কোনোদিনই সম্ভব নয়। তাঁর এই স্বপ্নের চিত্র পরাবাস্তব কবিতায় তিনি প্রকাশ করেছেন। এ কাবের বিভিন্ন কোরাস কবিতায় সেই পরাবাস্তবতায় পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি তাঁর কথাগুলো কখনোই সরাসারি বলেন না, বলেন ঘুরিয়ে পেচিয়ে, চিত্রকল্পে, প্রতীকে। কবি মাহবুব সাদিক সাতটি তারার তিমির নিয়ে যা বলেন; প্রসঙ্গত তা উল্লেখ করা যায়:
জীবনানন্দ দাশের সাতটি তারার তিমির বেরিয়ছিলো ১৯৪৮-এ। কিন্তু এ কাব্যের অধিকাংশ কবিতা রচিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে এবং যুদ্ধের যে অব্যবহিত উত্তরকাল। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর অবক্ষয় ও ধ্বংস তাই এ-কাব্যের বেশি কিছু কবিতায় পরোক্ষভাবে ছায়া ফেলেছে। জীবনানন্দ দাশ প্রায় কখনোই প্রত্যেক্ষভাবে পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে কিছু দেখান না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর উচ্চারণ পরোক্ষÑ শিল্পিত। এ- কাব্যেও যুদ্ধোত্তরকালের কবির বিশ্ববীক্ষা পরোক্ষ শিল্পসমৃ্িদ্ধ অর্জন করেছে। (মাহবুব সাদিক, জীবনানন্দ কবিতার নান্দনিকতা, পৃষ্ঠা-৭২)
জীবনানন্দ দাশের সাতটি তারার তিমির কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠ করে এই প্রতীতি জন্মে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবী অবক্ষয়ী মানবতার ভয়াল রূপ, নগ্নতা, মৃত্যু, মানুষের বিকলাঙ্গ চেতনা প্রভূতি চিত্রায়ণ ঘটেছে। কবি মানুষের আদিম ইতিহাস খনন করে, ঐতিহ্য চেতনার অনুষঙ্গে সেই ভঙ্গুর চিত্র যেমন দেখান তেমনি আগামী নবীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখান। তাঁর কাব্যস্বভাব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঐ একটি মাত্রা শব্দ ‘ চিত্ররূপময় ’ বলে যে মন্তব্য করেছিলেন, জীবনের শেষাবধি সেটিরই প্রয়োগ আমরা দেখতে পেয়েছি। গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দের প্রদত্ত উপাত্ত সংযোজন করা যায়: