সত্যজিৎ রায়ের লেখা ফেলুদা সিরিজের একদম অন্যরকমের একটা উপন্যাস হল 'ছিন্নমস্তার অভিশাপ'। এই উপন্যাসটিকে অন্যরকম বলার কারণ আছে। ফেলুদাকে নিয়ে লেখা প্রতিটি উপন্যাস বা গল্পেরই একটা না একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বা বিশেষত্ব আছে। কিন্তু সেধরণের বিশেষত্ব একটির বদলে দুইটি রয়েছে আলোচ্য উপন্যাসে। জমাটি রহস্য আর চমকজাগানিয়া ক্লাইম্যাক্স তো আছেই, সাথে বিশেষ যে দুটি জিনিস আছে তা হল অসংখ্য সাংকেতিক কোড আর সেগুলোর সমাধান এবং সার্কাস থেকে পালানো বাঘ নিয়ে দুর্ধর্ষ ও রোমাঞ্চকর কিছু মুহুর্ত।
এই উপন্যাসে দেখা যাবে ফেলুদাকে তোপসে আর লালমোহনবাবুকে সাথে নিয়ে লালমোহনবাবুরই গাড়িতে চড়ে হাজারিবাগ যেতে। যাত্রাপথে তারা জানতে পারে যে হাজারিবাগে সার্কাস এসেছে যার মূল আকর্ষন হল বাঘের খেলা। ফেলুদারা ঠিক করে ফেলে সার্কাস দেখতে যাবে। যাত্রাপথে অরুণবাবু নামের এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয় ফেলুদাদের এবং লোকটিকে তারা হাজারিবাগ অবধি লিফট দেয়ার বদলে তার বাসায় যাবার নিমন্ত্রনও পেয়ে যায়। হাজারিবাগে যেয়েই শোনা যায়, সার্কাস থেকে নাকি বাঘ পালিয়েছে! ফেলুদা, তোপসে আর জটায়ু দেখা করে সার্কাসের ম্যানেজার এবং বাঘের ট্রেনার কান্ডারিকারের সাথে যে কিনা এক আশ্চর্য চরিত্র। পরের দিন অরুণবাবুর বাসায় যায় তারা। দেখা হয় অরুণবাবুর বাবা মহেশবাবুর সাথে যিনি একজন অতি নামকরা রিটায়ার্ড অ্যাডভোকেট এবং অতি বিচিত্র চরিত্র। প্রথম দেখাতেই তার জীবনের অনেক অমীমাংসিত রহস্যের আভাস পায় ফেলুদা। লোকটা যে খুবই হেঁয়ালি তাও বুঝতে পারে। সেদিন ঐ পরিবারের সাথে পিকনিকে যায় তারা। পিকনিকের মধ্যেই হঠাৎ করে হার্ট এটাক করেন মহেশবাবু এবং বাড়ি ফিরে মারাও যান। মারা যাবার আগমুহুর্তে ফেলুদাকে কিছু দায়িত্ব দিয়ে যান তিনি এবং সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই নতুন কেসে জড়িয়ে পড়ে ফেলুদা। মহেশবাবুর ডায়রিতে লেখা অনেক সাংকেতিক হেঁয়ালি এবং তার পরিবারের সদস্যদের রহস্যময় আচরণের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে অনেক অজানা রহস্য ফেলুদার সামনে। একটা পর্যায় অবিশ্বাস্য কিছু তথ্য হাজির হয় ফেলুদার কাছে। একই সমান্তরালে সার্কাস থেকে পালানো বাঘটিকে নিয়েও বেশ কিছু থ্রিলিং সিকোয়েন্স আছে। যেভাবে কান্ডারিকার বাঘটিকে শেষ পর্যন্ত ধরতে সমর্থ হয়, তা নিঃসন্দেহেই পাঠককে 'রয়েল বেঙ্গল রহস্য' এর স্মৃতি মনে করিয়ে দেবে। এবং এই বাঘ ধরার সিনের মূল নায়ক কান্ডারিকারও শেষ দৃশ্যে এসে মহেশবাবুর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের রহস্যে একটা বড় ভূমিকা পালন করবে।
সবমিলিয়ে 'ছিন্নমস্তার অভিশাপ' উপন্যাসটিকে এক কথায় বলা যায় একের ভিতর অনেক। বিশেষ করে ধাঁধা, হেঁয়ালি ইত্যাদিতে ইন্টারেস্ট আছে যাদের, তারা এই বইটি পড়ে প্রভূত আনন্দ লাভ করবে বলে আমার বিশ্বাস। সাধারণ রহস্যপ্রেমিরাও কিন্তু উপন্যাসটি পড়তে পড়তে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাবে!