‘সব মেঘে বৃষ্টি হয় না’ একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এটি কথাসাহিত্যিক বাসার তাসাউফের একাধারে জীবনচরিত ও নব্বইয়ের দশকের সোনালি সময়ের স্মৃতিচারণ। পরিমার্জিত ও প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি পুরনো সেই সব দিনের কথা ও সেই সব সময়ের মানুষের জীবন-যাপন এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার বর্ণনা করেছেন। বাসার তাসাউফের জন্ম ও বেড়ে ওঠা অনন্তপুর নামের সবুজ বৃক্ষের ছায়া ছায়া মায়াময় নিভৃত এক গ্রামে। জন্মস্থান ও শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত সেই গ্রামের মানুষ, গাছপালা, পশু-পাখি, নদ-নদী তাকে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষ করে তার কিষান পিতা তার জীবনজুড়ে এতটাই মিশে আছেন যে, এই উপন্যাসের সব পাতা ভরেও তিনি উপস্থিত আছেন। পিতা ছিলেন তার বেঁচে থাকার, স্বপ্ন দেখার একমাত্র উপাদান। কিন্তু আকস্মিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় পিতার মৃত্যুতে তিনি ভীষণ মুষড়ে পড়েন। তাই নিজের জবানে বলা নিজের জীবনকাহিনি লেখা শুরু করেছেন পিতার মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে। এরপর মানবজীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের কথা, বিশেষ করেÑ দরিদ্র কিষান পিতার পাতায় ছাওয়া লতায় ঘেরা ছোট কুটিরে জন্ম নিয়ে তিনি যে অপূর্ণতার হাহাকারে জীবন ভর দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন তা এমন ভাবে বর্ণনা করেছেন মনে হয়, যেন সেই দীর্ঘশ^াসের উষ্ণ আঁচ এসে আমাদের হৃদয়ও উত্তপ্ত করে তোলে। তার মায়ের দিনের পর দিন না খেয়ে থাকার বর্ণনা হৃদয়ের গহিনে এমনভাবে আঘাত করে যে, রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। বৃষ্টির জল আর পোকামাকড় খসে পড়া ছনের ছাউনির তলে একডজন মানুষের বসবাস আর খেয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকার কথাগুলো এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যা পাঠকের চোখে জল এনে দেয়। বাসার তাসাউফ বইয়ের ভূমিকা অংশে উল্লেখ করেছেন, ‘আমি একজন অসফল মানুষ। আমার আব্বা একজন দরিদ্র কিষান ছিলেন। ফলে অনেক নিগূঢ়তা ও নিষ্ঠুরতা অতিক্রম করে জীবন চলার পথে আমাকে চলতে হয়েছে, পার হতে হয়েছে অসর্পিল ও কণ্টকাকীর্ণ অনেক পথ। কিন্তু গন্তব্য আজো রয়ে গেছে অচিনপুরে। সব পথেরই নির্র্দিষ্ট একটা সীমানা থাকে। কিন্তু আমার জীবন চলার পথের যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমি চলেছি তো চলেছি, না পেরিয়েছি সীমানা, না পেয়েছি গন্তব্য। জীবন চলার পথ অতিক্রম করে গন্তব্য পৌঁছাতে পারলে মানুষ অমরত্ব লাভ করে। অমরত্বে আমার লোভ ছিল না কোনোদিন। তাই হয়তো জীবনপথের দুর্গম সীমানা আমি আজো পার হতে পারিনি…।’ বলাবাহুল্য, একজন লেখক নিজের জীবনের গল্প নিজের জবানে বলার পর এর যে নিগূঢ় তাৎপর্য পাওয়া যায়, কাল্পনিক গল্পে তা পাওয়া যায় না। বাসার তাসাউফের এই বইয়ের গল্পে রূপকথার বয়ান নেই, আছে দরিদ্র এক কিষান পিতার ঘাম-জল সিঞ্চনের গল্প। নিতান্তই একজন ব্যর্থ মানুষের অপূর্ণতার গল্প। ব্যর্থতায় নিমজ্জিত হয়েও বাঁক বদল করে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার গল্প।
বাসার তাসাউফের লেখালিখি শুরু শৈশবে-কৈশোরেই। তখন স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে তথাকথিত ‘আউট’ বই নিয়ে দিন-রাত নিমগ্ন থাকত আর ছড়া-কবিতা লেখার চেষ্টা করত বলে বাড়ির লোকেরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত। অনেকে ভর্ৎসনা করে বলত, ‘ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে এসব নিয়ে মজে থাকলে শেষে না আবার পস্তাতে হয়।’
শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে এসেছে বহুদিন হলো। মধ্যযৌবনে এসে যখন ছড়া-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, থ্রিলার, রম্য, নন ফিকশন, শিশুতোষ ও কিশোর উপযোগী- সব মিলিয়ে ১৮টির মতো বই প্রকাশ হয়ে গেছে- এখনও বাড়ির লোকেরা সেই অমোঘ কথাগুলো বলে বেড়ায়। কিন্তু কথাগুলো এখন আর তাকে বিচলিত করে না। সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীতে সব মানুষ সফল হয় না। কেউ কেবল বেঁচে থাকে, কেউ আবার কোনোমতে টিকে থাকে। বাসার তাসাউফ কেবল বেঁচে থাকতে চায়নি, চেয়েছে কোনমতে টিকে থাকতে। টিকে থেকে দেখতে চেয়েছে এই পৃথিবীর এমন কিছু বিষয়- যা অন্য কেউ দেখেনি। রাতের নির্জনে যে টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ে, ফসলের মাঠ থেকে ভেসে এসে শিয়ালের ডাক আর ঝিঁঝি পোকার কোরাস যে মনের গহীনের বিষাদের আবহ তৈরি করে- তা কি কেউ শুনতে পেয়েছে কখনও? কেউ কি অবগাহন করেছে নারিকেল গাছের চিরল পাতার ফাঁকে জেগে থাকা পূর্ণিমার চাঁদের অবারিত আলোর বন্যায়? উপভোগ করেছে কি মেঘ জমে থমথমে আকাশ থেকে উপচেপড়া ঝুম ঝুম বৃষ্টির শব্দ? হয়তো আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, মাথার ওপরে ছাদ থাকলে বৃষ্টির শব্দ হয় উপভোগ্য আর পায়ের তলায় মাটি থাকলে হাওয়াই চপ্পলের শব্দও নূপুরের নিক্কণ ধ্বনি মনে হয়। বাসার তাসাউফ আকাশকে ছাদ আর মাটিকে অকৃত্রিম নির্ভরতা মেনে এই পৃথিবীতে দিন যাপন করে চলেছে। সফল ও ব্যর্থ মানুষে ভাগ হয়ে যাওয়া সমাজ-বাস্তবতায় স্বেচ্ছায় আপন করে নিয়েছে নিসঙ্গতাকে। অথচ তার চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভিড় আর সে যেন এক ঝাঁক কাকের কোলাহলে একটি নিভৃত কোকিল। আপন মনে গান গেয়ে যায়। কেউ শুনলেও তার গান চলে, কেউ না শুনলেও তার গান থামে না।