‘নাকাল’ একটি থ্রিলার উপন্যাস। বেশির ভাগ থ্রিলার উপন্যাসেই খুন, পুলিশ, গোয়েন্দা কিংবা রহস্যময় কোনো কাহিনি অনুসরণ করে গল্পের পরিসর বাড়তে থাকে। আর এ ধরনের কাহিনিকে ‘হুডানিট’ বলা হয়। ‘হুডানিট’ গল্পের শুরুতে বা মাঝপথে কোনো চরিত্রের মৃত্যু ঘটে অথবা খুন হয়। এরপর একজন গোয়েন্দা বা কোনো তীক্ষè বুদ্ধিদীপ্ত চরিত্র এসে সেই মৃত্যুরহস্য বা খুনের কারণ উদ্ঘাটন করে। কিন্তু ‘নাকাল’ সেই চিরাচরিত প্যাটার্নে লেখা হয়নি। এ উপন্যাসের কাহিনি শুরু হয়েছে শহরের নামকরা এক পত্রিকার সাংবাদিকের ঘরের দেয়ালে অদ্ভুতভাবে ফুটে ওঠা একটা ছবিকে ঘিরে। কুমিল্লা শহরের বিখ্যাত ধর্মসাগর পাড়ের নূরমহল নামের বাড়িতে ভাড়া থাকেন শহরের নামকরা পত্রিকার এক সাংবাদিক। এক রাতে তুমুল বৃষ্টির পর সেই বাড়ির দেয়ালে অদ্ভুত এক ছবি আবিষ্কার করেন তিনি। বৃষ্টির জলে ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে হওয়ার পর দেয়ালে ছবিটা ফুটে উঠেছিল। আর এই ছবিটাকে ঘিরেই এই উপন্যাসের কাহিনি বিস্তৃত হয়ে এগোতে থাকে। ছবিটা আবিষ্কৃত হওয়া যতটা না অদ্ভুত তার চেয়ে বেশি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যখন ছবির মানুষটাকে বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যায়। সাধারণত ‘হুডানিট’ কাহিনিতে কেউ একজন মারা যায় এবং তার মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়ে এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনাক্রম সাজানো হয়; যা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। পাঠকের কাছে বানোয়াট হিসেবে প্রতিভাত হয়। কিন্তু ‘নাকাল’ এর কাহিনি সে-রকম নয়। দেয়ালে ফুটে ওঠা ছবিটার সাথে মিল আছে এমন একজন মানুষের সন্ধান করতে গিয়ে কাহিনি বাঁক নেয় অন্যদিকে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় লেখক আমাদের এমন একটা গ্রামে নিয়ে যায়, যে গ্রামের সব মানুষই খুনী। পাতায় পাতায় রহস্য আর রোম হর্ষক কাহিনি ছড়িয়ে আছে এই উপন্যাসে। শেষ পাতায় গিয়ে পাঠককে সারপ্রাইজ হতে হবে। কী সারপ্রাইজ? সেটা পুরো উপন্যাস পড়ার আগে বোঝা যাবে না।
বাসার তাসাউফের লেখালিখি শুরু শৈশবে-কৈশোরেই। তখন স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে তথাকথিত ‘আউট’ বই নিয়ে দিন-রাত নিমগ্ন থাকত আর ছড়া-কবিতা লেখার চেষ্টা করত বলে বাড়ির লোকেরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত। অনেকে ভর্ৎসনা করে বলত, ‘ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে এসব নিয়ে মজে থাকলে শেষে না আবার পস্তাতে হয়।’
শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে এসেছে বহুদিন হলো। মধ্যযৌবনে এসে যখন ছড়া-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, থ্রিলার, রম্য, নন ফিকশন, শিশুতোষ ও কিশোর উপযোগী- সব মিলিয়ে ১৮টির মতো বই প্রকাশ হয়ে গেছে- এখনও বাড়ির লোকেরা সেই অমোঘ কথাগুলো বলে বেড়ায়। কিন্তু কথাগুলো এখন আর তাকে বিচলিত করে না। সে বিশ্বাস করে, পৃথিবীতে সব মানুষ সফল হয় না। কেউ কেবল বেঁচে থাকে, কেউ আবার কোনোমতে টিকে থাকে। বাসার তাসাউফ কেবল বেঁচে থাকতে চায়নি, চেয়েছে কোনমতে টিকে থাকতে। টিকে থেকে দেখতে চেয়েছে এই পৃথিবীর এমন কিছু বিষয়- যা অন্য কেউ দেখেনি। রাতের নির্জনে যে টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ে, ফসলের মাঠ থেকে ভেসে এসে শিয়ালের ডাক আর ঝিঁঝি পোকার কোরাস যে মনের গহীনের বিষাদের আবহ তৈরি করে- তা কি কেউ শুনতে পেয়েছে কখনও? কেউ কি অবগাহন করেছে নারিকেল গাছের চিরল পাতার ফাঁকে জেগে থাকা পূর্ণিমার চাঁদের অবারিত আলোর বন্যায়? উপভোগ করেছে কি মেঘ জমে থমথমে আকাশ থেকে উপচেপড়া ঝুম ঝুম বৃষ্টির শব্দ? হয়তো আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, মাথার ওপরে ছাদ থাকলে বৃষ্টির শব্দ হয় উপভোগ্য আর পায়ের তলায় মাটি থাকলে হাওয়াই চপ্পলের শব্দও নূপুরের নিক্কণ ধ্বনি মনে হয়। বাসার তাসাউফ আকাশকে ছাদ আর মাটিকে অকৃত্রিম নির্ভরতা মেনে এই পৃথিবীতে দিন যাপন করে চলেছে। সফল ও ব্যর্থ মানুষে ভাগ হয়ে যাওয়া সমাজ-বাস্তবতায় স্বেচ্ছায় আপন করে নিয়েছে নিসঙ্গতাকে। অথচ তার চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভিড় আর সে যেন এক ঝাঁক কাকের কোলাহলে একটি নিভৃত কোকিল। আপন মনে গান গেয়ে যায়। কেউ শুনলেও তার গান চলে, কেউ না শুনলেও তার গান থামে না।