ময়ূখ চৌধুরী - বাংলা সাহিত্যে এক বিস্মৃত নাম। অথচ চমৎকার আঁকার হাত, বেশকিছু মৌলিক লেখা ও অজস্র দুর্ধর্ষ অনুবাদের অধিকারী এই মানুষটি চাইলেই হয়ে উঠতে পারতেন দু বাংলার জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের একজন। যাক সে কথা।
ময়ূখ চৌধুরী রচনাসমগ্রের প্রথম খন্ডের মতই দ্বিতীয় খন্ডটিও বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে ময়ূখের পনেরোটি ছোটগল্প ও পাঁচটি উপন্যাস। সবকটিই ভরপুর এডভেঞ্চার, শিকার, অরণ্য ও অরণ্যের বন্যপ্রাণী নিয়ে।
বিশেষ করে যে কয়েকটি লেখার কথা উল্লেখ না করলেই নয় তার মাঝে আছে "মৃত্যুপুরীর অতিথি" যেই উপন্যাসে দেখা যায় কিভাবে এক খনি বিশেষজ্ঞ শ্বেতাঙ্গ ইকুয়েডরের গহীন অরণ্যে জিভারো ও অকা নামের হিংস্র উপজাতিদের মোকাবেলা করে জ্যান্ত ফিরে এসেছেন।
আরেকটি উপন্যাস হলো "সংখ্যার নাম চার"। যেখানে ময়ূখ ফুটিয়ে তুলেছেন এক প্রাচীন বৈদিক ভারতের রূপ। তৎকালীন আমলের সংস্কৃতি রাজনীতি দেশশাসন প্রজাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সবকিছুই ফুটে উঠেছে সুন্দরভাবে। লড়াই ও এডভেঞ্চার এরও কমতি নেই। শেষের টুইস্টগুলো খুব দুর্দান্ত ছিল।
.
" অধ্যাপক ত্রিবেদীর বিচিত্র কীর্তি" তে দেখা মিলে ময়ূখের নিজ হাতে সৃষ্ট মজাদার উদ্ভিদ বিজ্ঞানী প্রফেসর ত্রিলোকনাথ ত্রিবেদীর। তিনি কখনো গাছের পাতা খেয়ে শক্তিশালী হয়ে যান, হাডুডু খেলা বাজিমাত করেন, কখনো গুন্ডাদের হুমকি পেয়ে পালান, আবার কখনো হলুদ রাক্ষস রক্তশোষক গাছের মোকাবিলা করেন।
.
এই কমেডি লেখাটিতে ময়ূখ চৌধুরীর গেস্ট এপিয়ারেন্স আছে। জিনিসটা মজা লেগেছে। সেই সাথে সত্যজিৎ রায়ের মানুষখেকো গাছ নিয়ে কল্পধর্মী লেখা "সেপ্টোপাসের খিদে"র সাথে এই লেখাটির মিল পেলাম।
.
আর জ্যাক লন্ডনের সুবিখ্যাত "দি কল অব দি ওয়াইল্ড" এর যে অনুবাদ ময়ূখ চৌধুরী করেছেন তা আমার কাছে বেশ ভালোই লেগেছে। ব্যক্তিগত মতামত।
.
ছোটগল্পের মাঝে আমি বলবো "মার্জারের অপমৃত্যু" এককথায় এক নম্বর। সিনোগা গ্রান্ডি নামের এক বিশাল জলাভূমি, যা গিজগিজ করছে কেম্যান কুমির আর বিষধর ওয়াটার মোকাসিন সাপে, সেখানে জাগুয়ার শিকার করতে গিয়ে দুই ভাইয়ের অমানুষিক অভিজ্ঞতার বিবরণ আছে এই গল্পে। খুব ভালো লেগেছে এই গল্পটি। জাগুয়ার কী জিনিস বুঝা গেছে!
.
ময়ূখ যে আর দশজন এডভেঞ্চার লেখকের মত শুধু বাঘ আর সিংহ নিয়েই পড়ে থাকেননি, প্রাণীজগতের সব জন্তু জানোয়ার সম্পর্কেই তাঁর সম্যক ধারণা ছিল তার উদাহরণ "গুন্ডা" (যার প্রধান চরিত্র একটি ওয়ার্ট হগ, তাও আবার ভারতের জমিদারি পটভূমিতে), "সীমান্তের বিভীষিকা" (অ্যানাকোন্ডা), "বিংশ শতাব্দীর রূপকথার ড্রাগন" (কোমোডো ড্রাগন) এবং "বানর সেনার বন্দি" (বেবুন) - ইত্যাদি ছোটোগল্প। অরণ্যের রঙিন বৈচিত্র্যের প্রমাণ গল্পগুলো।
.
এছাড়া ইংলিশ লিজেন্ড রবিনহুড কে নিয়ে লেখা দুটি ছোটগল্প মন কেড়েছে। " শেরউড বনের পলাতক" ও "বন্ধু রবিনহুড"।
.
সব মিলিয়ে বেশ ভালো অভিজ্ঞতা। ধন্যবাদ প্রাপ্য লালমাটির - ময়ূখকে আবার পাঠকের কাছে জীবন্ত করে তোলার জন্য।
.
বইঃ ময়ূখ চৌধুরী রচনাসমগ্র (দ্বিতীয় খন্ড)
প্রকাশকঃ লালমাটি
গায়ের মূল্যঃ ৫০০/-। আমি বাংলাদেশে কিনেছি ১.৬ কনভার্সন রেটে ৮০০/- টাকায়।
.
রেটিং ৫/৫। জীবন হোক বইময়। ❤️