‘‘আই এম নুজুদ, এজ টেন অ্যান্ড ডিভোর্সড’’ কোনো কল্পকাহিনি নয়- এটি এক নিষ্পাপ শিশুর বাস্তব জীবনের নির্মম সত্য গল্প। ইয়েমেনের প্রত্যন্ত এক গ্রামে জন্ম নেওয়া নুজুদ আলীর জীবনসংগ্রাম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার অভূতপূর্ব প্রতিবাদ এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের পথে জয়ী হওয়ার গল্পই এই বইয়ের মূল উপজীব্য। নুজুদের নিজের জবানবন্দিকে অবলম্বন করে ফরাসি সাংবাদিক ডেলফিন মিনো অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বইটি রচনা করেছেন। পরবর্তীতে এটি বিশ্বের ষোলোটি ভাষায় অনূদিত হয়।
নুজুদ কোনো রাজকন্যা নয়- তার জন্ম দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে, যেখানে তার সঠিক বয়স পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। বয়স অনুমানের ভিত্তিতে দশ বছরের কাছাকাছি ধরা হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর মতামতের কোনো মূল্য নেই- এই চিরাচরিত নিয়মের বলি হয় নুজুদও। বাবার সিদ্ধান্তে নিজের চেয়ে তিনগুণ বড় এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় তার, বিয়ের অর্থ কী তা বোঝার আগেই। বিয়ের প্রথম রাতেই সে টের পায় ‘স্বামী’ নামক মানুষটির নরপশুত্ব। শুরু হয় এক শিশুর বেঁচে থাকার লড়াই।
এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, নুজুদের মানসিক দৃঢ়তা। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাঝেও সে ভেঙে পড়ে না। বরং অসম সাহস নিয়ে সে আদালতের দ্বারস্থ হয় এবং বিয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় ডিভোর্স চেয়ে বসে। এই ঘটনাই তাকে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ ডিভোর্সি হিসেবে পরিচিত করে তোলে। তার এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত মুক্তি এনে দেয়নি, বরং ২০০৯ সালে ইয়েমেনে ছেলে-মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৭ বছর নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চরিত্রচিত্রণে বইটি অত্যন্ত জীবন্ত। নুজুদ চরিত্রটি বয়সে ছোট হলেও অভিজ্ঞতায় পরিণত- তার ভাবনা, ভয়, প্রতিবাদ পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে। শাদা খালা নামের উকিল চরিত্রটি বইয়ের আরেকটি আলোকবর্তিকা। তাঁর সহানুভূতিশীল আচরণ ও পেশাগত নিষ্ঠা নুজুদের নতুন করে আত্মবিশ্বাস জোগায়। বিপরীতে, নুজুদের স্বামী চরিত্রটি মানবতার সম্পূর্ণ বিপরীত- নির্মমতা ও নির্যাতনের প্রতীক। পাশাপাশি মনা আপা, ফারেস ভাই, হাইফা প্রমুখ ভাইবোনদের উপস্থিতি নুজুদের পারিবারিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্তফ এই বইকে আখ্যা দিয়েছেন “এক তেজস্বা নারীর জীবনকাহিনি” হিসেবে। ওয়াশিংটন পোস্ট একে ‘‘ইয়েমেনের সামাজিক চ্যালেঞ্জ অনুধাবনের অনন্য দলিল’’ বলে উল্লেখ করেছে। হিলারি ক্লিনটনের মতো বিশ্বনেত্রী নুজুদের সাহসিকতাকে “অসাধারণ দৃষ্টান্ত” বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এসব মন্তব্য প্রমাণ করে- এই বই শুধু সাহিত্য নয়, এটি একটি সামাজিক দলিল।
সব মিলিয়ে, ‘‘আই এম নুজুদ, এজ টেন অ্যান্ড ডিভোর্সড’’ শিশু বিবাহ, নারী নিপীড়ন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রতিবাদ। এটি এক শিশুর কান্না নয়- এটি এক যোদ্ধার কণ্ঠস্বর। বইটি পাঠককে কাঁদায়, ক্ষুব্ধ করে, আবার আশার আলোও দেখায়। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে এই বইটি নিঃসন্দেহে পাঠযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক।