গাজী সালাহউদ্দীন ছিলেন আরব, তুর্কি ও কুর্দি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ১১৯৩ সালে তিনি দামেস্কে মৃত্যুবরণ করেন। 'জেরুজালেম' ক্রুসেডে কাছ মুক্ত করার জন্য প্রসিদ্ধ হয়ে আছেন, মুসলিম ইতিহাসে।
'সালাদিন' বাল্যকালে যখন চাচা শিরকুহ কাছ থেকে শুনছেন জেরুজালেমে তাঁর স্ব-জাতি করুন কাহিনী আর বায়তুল-আকসা ক্রুসেডার কর্তৃক স্পর্ধা৷ তখন কিশোর আইউবী প্রতিজ্ঞা করেছেন, আমি অবশ্যই জেরুজালেম মুক্ত করব ।
মিশরে শাসক অধিষ্ঠিত হয়ে নিজের আসন (Throne) শক্ত করে প্রশাসনিক ও সামরিক সংস্কার আনয়ন, বিদ্রোহী দমন, তারপর তাঁর প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য সালাদিন তাঁর সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাত্রা করলেন কায়রো থেকে জেরুজালেম উদ্দেশ্য। যার জন্য শত-শত অধীর অপেক্ষাই ছিলেন৷ সালাহ-উদ্দিন কখনো আবেগী বা উত্তেজিত হতেন না, কিন্তু যখন তাঁর চোখের সামনে বায়তুল আকসা আর সেই অত্যাচারিত স্ব-জাতি ভাই-বোন গুলো দৃশ্য ভেসে উঠত, তখন তিনি আর স্থির হয়ে থাকতে পারেন না, সারাক্ষণ পেরেশানি অবস্থায় অতিক্রম করতে হত।
কিন্তু নাহ, আশা পূরণ হলো না।ডানে-বামে, সামনে-পিছনে তাকে তার স্ব-জাতি বিদ্রোহী সাথে লড়তে হল, কোন উপায় ছিল না তাঁর। জেরুজালেম যাওয়ার জন্য পথে শতরকম ষড়যন্ত্র (Conspiracy) এমনকি তাঁকে কয়েকবার ফেদাইন (Assassination) লেলিয়ে দিয়েছিল তা ক্রুসেডার নয়, বরং তার স্ব-জাতি শাসকগোষ্ঠী ৷ ইতিহাস সাক্ষী সম্পদ-খ্যাতি-নারী-ক্ষমতা তা মানুষকে এমনভাবে অন্ধ-বধির-বোবা বানায়, শেষ পর্যন্ত পিতা-পুত্রে সাথে, মাতা-পুত্রে সাথে, ভাই-বোন সম্পর্ক চ্ছিন্ন করার মত নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় রাজতান্ত্রিক পরিবারে মধ্যে। এর চাইতে মারাত্মক হচ্ছে, ভাই তাঁর সহোদর ভাইকে হত্যা পর্যন্ত বিবেক জীবন্ত-লাশ হয়ে যায়। সালাদিন এর ক্ষেত্রে কোন ব্যতিক্রম হলো না, তাঁর স্ব-জাতি বিদ্রোহী ভাইয়ের নিকৃষ্ট কার্যকলাপ।
অবশেষে, পথে ও আশে-পাশে ফাঁদ পাতানো উদ্যেক্তা ও তার অংশগ্রহণ করা সেসব বিদ্রোহী কতক সৈনিকদের দূরে সরিয়ে, কতক বিদ্রোহী সৈনিকদের দলে ভিড়িয়ে হিট্টিনে অঞ্চলে, এরপরে তাঁর শেষ মঞ্জিল জেরুজালেম। যার জন্য রাতের বেলা ঘুম হারাম হয়ে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রামে ব্যাপারে হুঁশ পর্যন্ত থাকে না।
দু'পক্ষ থেকে যে নির্মম যুদ্ধ হয়েছিল খ্রিস্টান আর মুসলমান, তা কোন ভাবেই ছাড়তে রাজী নয়, কারণ দুই ধর্মের কাছে বায়তুল-আকসা ছিল একই রকম পবিত্র ও মর্যাদাবান। এটাকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ, তা কোন পার্থিব স্বার্থ নয়, আদর্শগত ছিল। এখানে কে ভূল বা কে ঠিক সেটা প্রসংগে আসছে না। ... সন্ধি আলোচনা সময়ে সালাদিন ও ক্রুসেডার অধিনায়ক দ্বয়ের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হচ্ছে৷ ক্রুসেডার একজন অধিনায়ক বলল, জেরুজালেম আমাদের। আমরাই এই ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রাধিকার, আপনার ও মুসলমানদের জন্য কারো অধিকার নাই। সালাদিন এরকম জবাব বারুদের মত জ্বলছেন, কিছু বলতে যাবেন এই সময় তাঁর কানে কেউ শুনিয়ে দিয়ে গেল, জেরুজালেমের পতন ঘটেছে। তখন সালাহ-উদ্দিন টেবিলে এক প্রচণ্ড মুষ্ঠি মারলেন, ক্রুসেডার অধিনায়কের প্রতি এবার মোক্ষম জবাব দিয়ে দিলেন, জেরুজালেম এখন তোমাদের নয়, আমাদের।
ক্রুসেডার অধিনায়ক'গণ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তাঁবু থেকে বের হয়ে দেখল, দূর্গের চূড়ায় ক্রসের বদলে এখন হেলানী চন্দ্রের পতাকা দখল করে আসে। হেরে গেল ক্রুসেরডার বাহিনী এবং খ্রিস্টান জগৎ আর বিজয়ী হলেন সালাদিন ও তাঁর সৈন্যবাহিনী আর মুসলিমে উম্মত। (২০১৯)