লেখকের কথা
চিকিৎসক হয়েও 'কুরআনিক আরবী ব্যাকরণ' লিখতে কলম ধরার কারণ...
শ্রদ্ধেয় পাঠকবৃন্দ!
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমি আরবী ভাষার কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি নই। আমি একজন চিকিৎসক (বিশেষজ্ঞ সার্জন)। তাই আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক- একজন চিকিৎসক যিনি আরবী ভাষার পণ্ডিত নন, তিনি কেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় বাদ দিয়ে কুরআনিক আরবী ব্যাকরণ নিয়ে লিখতে গেলেন। তাই এ বিষয়ে কেন কলম ধরেছি, সেটা প্রথমে আপনাদের জানানো দরকার বলে মনে করছি।
আমার শিক্ষাজীবন শুরু কওমী মাদ্রাসায়। হিদায়েতুন নাহু পর্যন্ত মাদ্রাসায় পড়ানোর পর আমাকে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া হাইস্কুল-এ ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। এরপর SSC, HSC এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে MBBS পাশ করার পর ইরাক সরকারের চাকুরি নিয়ে ১৯৭৯ সালে আমি ইরাকে যাই। ইরাকে ৪ বছরের চাকুরিকালে রোগীদের সাথে আরবীতে কথা বলতে হতো বলে দ্রুত আরবী কথা বলা শিখে ফেলি। শিক্ষাজীবনের শুরুতে মাদ্রাসা শিক্ষা এ ব্যাপারে আমার অনেক উপকারে এসেছে। তবে যে আরবী কথা বলতাম সেটি হতো শিশুদের কথা বলা শুরু করার স্তরের মতো কথা বলা। অর্থাৎ শব্দ শিখে সে শব্দ জোড়া লাগিয়ে কথা বলা। আরবী ব্যাকরণের লেশমাত্র সেখানে থাকতো না। কিন্তু কোনো আরবকে তাতে অখুশি হতে দেখিনি। বরং তারা আমার আরবী কথা শুনে খুশি হতো। চার বছর ইরাকে চাকুরি করার পর আমি উচ্চতর পড়াশুনা করার জন্য ইংল্যান্ডে যাই এবং FRCS ডিগ্রি নিয়ে ১৯৮৭ সালে দেশে ফিরে আসি।
ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসে আমার মনে হলো জীবিকা অর্জনের জন্য বড়ো বড়ো বই পড়ে MBBS ও FRCS ডিগ্রি নিয়েছি। এখন যদি কুরআন মাজীদ অর্থসহ বুঝে না পড়ে আল্লাহর কাছে চলে যাই, আর আল্লাহ যদি জিজ্ঞাসা করেন- ইংরেজি ভাষায় রচিত বড়ো বড়ো বই পড়ে স্বনামধন্য চিকিৎসক হয়েছিলে কিন্তু তোমার জীবন পরিচালনার পদ্ধতি জানিয়ে আরবীতে আমি যে কিতাবটি (কুরআন মাজীদ) পাঠিয়েছিলাম সেটি কি অর্থসহ বুঝে পড়েছিলে? তখন এ প্রশ্নের আমি কী জবাব দেবো?
এ উপলব্ধি আসার পর আমি কুরআন মাজীদ অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ বুঝে পড়তে শুরু করি। শিক্ষাজীবনের শুরুতে মাদ্রাসায় পড়ার কারণে আগে থেকে আরবী পড়তে ও লিখতে পারতাম। এরপর ইরাকে ৪ বছর রোগী ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে আরবী বলা ও বোঝার সমস্যাটা অনেকাংশে দূর হয়ে যায়।
কুরআন মাজীদ পড়তে গিয়ে দেখি ইরাকে যেসব সাধারণ আরবী বলতাম তার অনেক শব্দই কুরআনে আছে এবং আমি তা বুঝতে পারি। তাই কুরআন মাজীদ পড়ে বেশ মজা পেয়ে যাই। তাছাড়া দেখতে পাই কুরআনে আল্লাহ বার বার বলেছেন কুরআন বোঝা সহজ। যদিও ছোটোবেলা থেকে শুনেছি কুরআনের আরবী বোঝা খুব কঠিন। পেশা নিয়ে সারাক্ষণ আমাকে ব্যস্ত থাকতে হতো। কিন্তু এর মধ্যেও সময় করে দিনে এক বা একাধিক আয়াত বা যতটুকু পারা যায় তাফসীরসহ কুরআন মাজীদ পড়তে থাকি। সার্জারি বই যেমন গভীরভাবে বুঝে পড়েছি, কুরআনের প্রতিটি আয়াতও সেভাবে পড়ার চেষ্টা করেছি। ব্যাখ্যা জানার জন্য কয়েকটি তাফসীর পড়েছি। এভাবে সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ শেষ করতে আমার প্রায় ৩ বছর সময় লাগে।
সম্পূর্ণ কুরআন মাজীদ পড়ে তথা ইসলামের সব মৌলিক বিষয় প্রত্যক্ষভাবে জানার পর আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম এজন্য যে, ইসলাম সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য আর বর্তমান মুসলিমদের ধারণার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। এ ব্যাপক পার্থক্যই আমার মধ্যে এ ব্যাপারে কলম ধরার দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। সর্বোপরি, কুরআনের সুরা বাকারার ১৭৪ নং আয়াতের বক্তব্য "নিশ্চয় আল্লাহ কিতাবে যা নাযিল করেছেন, যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে সামান্য কিছু ক্রয় করে (লাভ করে) তারা তাদের পেট আগুন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ভরে না, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদের পবিত্রও করবেন না (তাদের ছোটোখাটো গুনাহও মাফ করবেন না), আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি" আমাকে কলম ধরতে বাধ্য করলো।
আল কুরআন পড়া শেষ করেই আমি লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হাদীস না পড়ে কলম ধরতে মন চাইলো না। তাই আবার হাদীস পড়তে শুরু করি। হাদীস, বিশেষ করে মিশকাতুল মাসাবীহ (সিহাহ সিত্তার হাদীসসহ আরো অনেক হাদীসগ্রন্থের হাদীস ধারণকারী গ্রন্থ) বিস্তারিত পড়ার পর আমি লেখা শুরু করি এবং প্রতিটি বিষয় ছোটো বই আকারে প্রকাশ করতে থাকি।
ইসালামের মৌলিক বিষয় নিয়ে গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ হতে থাকলে অনেকে বলতে থাকেন- উনি আরবী ব্যাকরণ জানেন না, উনার ইসলামী বিষয়ের গবেষণাধর্মী বই আর কতটুকু মানসম্মত হবে? এ কথা আমার কানে আসলেও আমি কোনো প্রতিবাদ করিনি। কারণ, আমি যতটুকু আরবী ব্যাকরণ ঐ সময়ে জানতাম তাকে আরবী ব্যাকরণ জানা বলা যাবে না। তাই আমি আরবী ব্যাকরণ জানি না, তাদের কথার এ অংশটুকু সত্য।
গবেষণা, লেখা ও বই প্রকাশ চলতে থাকাকালীন আমি ঢাকার একটি আরবী ব্যাকরণ শিক্ষার ক্লাসে ভর্তি হই। কয়েকটি ক্লাস করার পর তাদের ক্লাস এবং লেখা ব্যাকরণের বই আমার কাছে খুব কঠিন ও অগোছালো মনে হলো। তাই সে ক্লাস করা আমি বন্ধ করি।
গবেষণাধর্মী ৩৩টি বই বের হওয়ার পর আমার মনে হলো- আমাদের আল কুরআনের অনুবাদগ্রন্থ বের করা দরকার। কারণ, মানুষ যখন সমাজে চালু থাকা কুরআনের অনুবাদ বা তাফসীর পড়বে বা যাচাই করবে তখন আমাদের বইগুলোর তথ্যের সমর্থক কোনো তথ্য সেখানে পাবে না। তখন আমাদের বইগুলোর তথ্য গ্রহণ করতে সে দ্বিধায় পড়ে যাবে। তাই আমি কুরআনের অনুবাদগ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করি। এ বিষয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ালো আমার আরবী ভাষা ও ব্যাকরণের জ্ঞান। কারণ, আরবী ভাষা ও ব্যাকরণের যে জ্ঞান আমার আছে তা দিয়ে সরাসরি আরবী কুরআনের অনুবাদ করা অসম্ভব। আমি ভাবতে থাকি এবং আল্লাহ তা'য়ালার কাছে সাহায্য চাইতে থাকি।
ভাবতে ভাবতে একদিন মাথায় আসলো- কুরআন অধ্যয়ন করে কুরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা করার যে মূলনীতি আমি জানতে পেরেছি তার আলোকে প্রচলিত একটি অনুবাদকে সম্পাদনা করে সম্পাদিত অনুবাদগ্রন্থ বের করা যায় কি না। তারপর আমি সম্পাদনার কাজ শুরু করে দেই। কিছুদূর এগিয়ে আমার মনে হলো এ পদ্ধতিতে আল কুরআনের ভালো একটি অনুবাদ বের করা সম্ভব। জুলাই ২০১৪ সালে 'আল কুরআন যুগের জ্ঞানের আলোকে অনুবাদ' নাম দিয়ে কুরআনের সম্পাদিত অনুবাদগ্রন্থ বের করি। আলহামদুলিল্লাহ, অনুবাদটি পাঠকদের কাছে খুবই সমাদৃত হয়।
কুরআনের অনুবাদ বের করার পর আমার মনে হলো আমাদের গবেষণার বিষয়গুলো মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে চালু থাকা কথার সরাসরি বিপরীত। তাই শুধু একটি কুরআনের অনুবাদে সম্পূরক তথ্য পেয়ে বা দু-একটি লেকচার শুনে বইগুলোর তথ্য মানুষের বোঝা ও তার প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হওয়া কঠিন হবে। সুতরাং
এগুলো শেখানোর জন্য কোনো কোর্স চালু করতে হবে। চিন্তাভাবনার পর আমরা 'থ্রি-ইন-ওয়ান কুরআন শিক্ষা কোর্স নামে একটি কোর্স শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম এ কোর্সে রাখা হলো-
১. সহীহ তিলাওয়াত শিক্ষা
২. কুরআনের জ্ঞানার্জনের মূলনীতি ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা
৩. কুরআনিক আরবী ব্যাকরণ
সিদ্ধান্ত হলো সহীহ তিলাওয়াত শেখাবেন হাফিজ মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ বকশী, কুরআনের জ্ঞানার্জনের মূলনীতি ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা পড়াবো আমি প্রফেসর ডা. মো. মতিয়ার রহমান এবং কুরআনিক আরবী ব্যাকরণ পড়াবেন ঢাকায় আরবী ব্যাকরণ শেখান এমন এক ব্যক্তি।
কোর্সটি ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম জুময়াবার কুরআন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অডিটোরিয়ামে আমরা শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ প্রথম ব্যাচেই আমরা বেশ শিক্ষার্থী পেয়ে যাই। কোর্স চলতে থাকল। দেখা গেল ১ম ও ২য় বিষয়ে শিক্ষার্থীরা খুব খুশি কিন্তু ৩য় বিষয়ে তা নয়। তাই ৩য় বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিনদিন কমে যেতে লাগল। অন্যদিকে আমি লক্ষ করলাম ঐ শিক্ষক ব্যাকরণ শেখানোর মাঝে মাঝে এমন কথা বলছেন যা আমাদের গবেষণার বিপরীত এবং তার উপস্থাপনা গোছালো নয়। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম কুরআনিক আরবী ব্যাকরণ আমাকে শেখাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো আমার আরবী ব্যাকরণে জ্ঞানের স্বল্পতা।
৩৩টি গবেষণাধর্মী বই লেখা এবং কুরআনের অনুবাদ সম্পাদনা করার পর আরবী ভাষা ও ব্যাকরণের জ্ঞান কিছুটা উন্নত হলেও তা আরবী ব্যাকরণ শেখানোর জন্য মোটেই যথেষ্ট ছিল না। তাই বাজারে বিদ্যমান আরবী ব্যাকরণের মোটামুটি জনপ্রিয় একটি বই সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করলাম। আগে আরবী ব্যাকরণ শেখার কোর্সে ক্লাস করার সময় যে ব্যাকরণের বইটি কিনেছিলাম সেটি এবং নতুন ব্যাকরণের বইটি মিলিয়ে পড়তে লাগলাম এবং সাথে সাথে পড়ানোর মতো করে ল্যাপটপে তা কম্পোজ করতে থাকলাম। এভাবে ৫-৬ মাসের মধ্যে মোটামুটি কিছুটা দাঁড় করাতে সক্ষম হলাম। এর মধ্যে 'থ্রি-ইন-ওয়ান কুরআন শিক্ষা কোর্স-এ যিনি আরবী ব্যাকরণ শেখাতেন তিনি লম্বা ছুটিতে দেশের বাইরে গেলেন। ঐ সময় আমাদের কোর্সের নতুন ব্যাচ শুরু হওয়ার কথা। আল্লাহর ওপর ভরসা করে ঐ ব্যাচে কুরআনিক আরবী ব্যাকরণের ক্লাস আমি নেবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার এ সাহস করার একটি কারণ হলো জ্ঞানার্জনের সোনালি নিয়মে (Golden rules of learning) থাকা 'আমি শেখাই, আমি পাণ্ডিত্য অর্জন কবি' কথাটি আলহামদুলিল্লাহ, কয়েকটি ক্লাস নেওয়ার পরই শিক্ষার্থী ও অন্যান্যদের কাছ থেকে উৎসাহব্যাঞ্জক সাড়া আসতে লাগল। জ্ঞানার্জনের সোনালি নিয়মে আমার আরবী ব্যাকরণের জ্ঞানও উৎকর্ষিত হতে থাকল। এ সময় আমি অন্য একটি আরবী ব্যাকরণ বই পেলাম। এ বইটির মধ্যে কিছু তথ্য বেশ ভালো পেলাম। তবে এ বইটির উপস্থাপন পদ্ধতি আমার কাছে দুর্বল মনে হলো। এরপর এ তিনটি আরবী ব্যাকরণ বইয়ের তথ্য এবং আমার বুঝের আলোকে সাজিয়ে থ্রি-ইন-ওয়ান কুরআন শিক্ষা কোর্সের কুরআনিক আরবী ব্যাকরণের ক্লাস সাজাই এবং সে আলোকে ক্লাস নিতে থাকি। শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া ও আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পারলাম এখন 'কুরআনিক আরবী ব্যাকরণ'-এর বই লেখা যায়। আল্লাহর সাহায্য চেয়ে ১৫.১২.২০১৭ তারিখে এ বই লেখা শুরু করি। বইটি 'কুরআনের আরবী বোঝা ভীষণ কঠিন' এ মিথ্যা ভয় দূর করার ব্যাপারে বেশ সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।
অনেকে, বিশেষ করে কুরআন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষণা ফেলো এবং দাওয়াহ বিভাগের এক্সিকিউটিভ হাফিজ মাওলানা মুহসিন মাশকুর এবং প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্বশীল বনি আমিন বইটি প্রকাশের ব্যাপারে আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। তাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে যথাযথ পুরস্কার দেওয়ার জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করছি। ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ রেখে এবং আপনাদের দোয়া চেয়ে শেষ করছি। হে আল্লাহ! আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে - কবুল করুন।
আমিন! ছুম্মা আমিন!!