বইয়ের ব্যাপারে দুই তিনজন থেকে প্রথমে যে রিভিউ পেয়েছিলাম এক কথায় ছিলো, বইটা পড়ার পর থেকে তুরস্কে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রবল হলো। আমিও ভাবছিলাম আমারও এমন কোনো ইচ্ছেই হবে হয়তো। আর হবেই না কেনো! যেখানে গেলে দেখা যাবে- ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়া মসজিদ, চোখ ধাধানো নীল মসজিদ, ইস্তাম্বুলের রাজকীয় সৌন্দর্য, তোপকাপি প্রাসাদ, মাওলানা রুমীর সমাধিস্থল, আয়ুপ সুলতানের মাজার, সুলতান আল ফাতিহের মাজার, বিখ্যাত সুলতানি মসজিদ, বসফরাসের নীল জলরাশিতে নৌকাভ্রমণ। তাছাড়া অন্যতম আকর্ষণীয় তোপকাপি প্রাসাদে রয়েছে- প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ এর দন্ত মোবারক, নবুওয়াতের সিলমোহর, তাঁর তলোয়ার, ঢাল, বর্শা, লাঠি, একটি চিঠি। রয়েছে জান্নাতী নারীদের সরদার নবী কন্যা ফাতিমা রা. ব্যবহৃত জায়নামাজ, তাঁর পরিধেয় বস্ত্র, তাঁর ছেলে হুসাইন রা. এর ছোট্ট একটা জামা। ইবরাহীম আঃ ব্যবহৃত পাত্র, মুসা আঃ এর হাতের লাঠি, ইউসুফ আঃ এর পাগড়ি, দাউদ আঃ এর তলোয়ার, ইয়াহইয়া আঃ এর বাহুবন্ধনী আর তাঁর পবিত্র মস্তকের খন্ডিতাংশ। এছাড়া আরও কত কী!
এই সবকিছুর চেয়ে বইয়ের অন্য একটা অংশ আমার মন কেড়েছে। আগে বই সম্পর্কে কিছু বলি।
.
মাওলানা জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দির তুরস্কে পাঁচদিন সফরের গল্প নিয়েই বইটি। সফরসঙ্গী ছিলেন ড. মুসতফা কামাল৷ জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দি নামটা শুনেছি, পড়েছি আগে, কিন্তু বিস্তারিত জানা নেই। বইয়েও তেমন সন্তোষজনক পরিচয় পেলাম না। অল্প করে কিছু থাকলেও ভালো হতো, আমার মতো পাঠকদের জন্য।
বইয়ের যে বিষয়টা আমার মন কেড়েছে সেটা হলো, ভ্রমণের চতুর্থ দিন একটি মসজিদে উপস্থিত সকলে হজরতকে ঘিরে বসে, বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। আর তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন। এই প্রশ্নোত্তর পর্বটা আমার বেশ ভালো লেগেছে, মনে হচ্ছিলো আরও যদি কিছু আলোচনা থাকতো। এখনো মূলত আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রিয় হওয়ার, গুনাহ মাফের উপায়, পূর্ববর্তী ব্যক্তিবর্গের চেয়ে এখনকার যুগের মানুষ কত সহজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে, নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারে- সেগুলোই আলোচনা করা হয়েছে।
আলোচনাপ্রসঙ্গে শায়খ চমৎকার সব উদাহরণ দিয়েছেন। এছাড়া মাওলানা রুমী ও শামস তাবরিজের পরিচয়, মুহাম্মদ আল ফাতিহের ইস্তাম্বুল বিজয়, উসমান গাজির গল্প, আবু আইয়ুব আনসারি রা. জীবন ও কর্ম- এই টপিকগুলো কিছু আগে জানতাম কিছু নতুন জানলাম। এগুলো পড়তে খুব ভালো লাগছিলো।
সবমিলিয়ে পুরো বইটাই পড়তে ভালো লেগেছে। বইয়ের অনুবাদও সহজবোধ্য ছিলো। কবিতার অনুবাদগুলোও সুন্দর ছিলো। দু'একটা বানান ভুল ছিলো, তবে কিছু শব্দে স্পেস দেওয়া নেই। বিশেষ করে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা যেখানে যেখানে লেখা সেখানেই স্পেস ছাড়াই পরের শব্দটা যুক্ত। এছাড়া বইয়ে তেমন ভুল ছিলো না। ছোট ছোট টীকাগুলো নতুন শব্দ বুঝতে সাহায্য করেছে।
শেষদিকে মনে হচ্ছিলো, বইটা আরেকটু বড় হলেও পারতো। কিন্তু তাঁদের ভ্রমণ যে ছিলো পাঁচদিনের, পাঁচ দিন বর্ণনা শেষে বইয়ের ইতি তো টানতেই হয়, তাই না!
Was this review helpful to you?
By Sabbir , Oct 11, 2019
শায়েখ নকশবন্দী। স্বপ্নযোগে নবীজির আদেশ পেয়ে বেরিয়ে পড়েন সফরে। আল্লাহভোলা মানুষদের আল্লাহমুখী করতে। একে একে ঘুরে ফেরেন আশিটির মতো দেশ। একদিন এসে পৌঁছান খিলাফতের দুর্গ ইস্তাম্বুলে। যোগ্য সহযোগীদের নিয়ে ইতিহাসের সোনালি বাঁকগুলোয় নজর বুলিয়ে যান শায়েখ। খুঁজতে থাকেন পতনের কারণ ও উত্তরণের পথ। কলব-কলম আর অসি-মসির মাঝখানের দূরত্বই উম্মাহকে লাঞ্ছনার চোরাবালিতে ডুবিয়েছে, দরদভরা কন্ঠে বলে যান শায়েখ। এদুটোর সমন্বিত ব্যবহারই আবার ফিরিয়ে আনতে পারে পূর্বের সোনালি ইতিহাস। মুহাম্মদ আল ফাতিহের ইস্তাম্বুল আর মাওলানা রুমির কোনিয়া সফর করে যেন প্রায়োগিকভাবে কথাটির প্রমাণ দিলেন শায়েখ নকশবন্দী।
তাসাওউফ সিলসিলার বিশ্বখ্যাত কিছু মাশায়েখের অনবদ্য এক সফরনামা ‘তুরস্কে পাঁচ দিন’।
লেখক : ড. মুসতফা কামাল ।