বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে সমাজ-বাস্তবতার অনিবার্য প্রয়ােজনে সিলেটি নাগরীলিপি, ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব বিকাশ বিস্তৃতি। এবং কালের অমােঘ নিয়মে ব্যবহারিক প্রয়ােজন ফুরিয়ে যাওয়ায় এখন প্রায়-লুপ্ত । কিন্তু প্রায় পাঁচশ বছর ধরে এ-লিপি চর্চার ভেতর দিয়ে আমাদের ভূগােলের একটি বৃহৎ অংশে যে । ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও সৃজনচর্চা চলেছে—এটি আমাদের ঐতিহ্যের এক অক্ষয় সম্পদ। বলা হয়, হজরত শাহজালাল ও তার শিষ্যদের হাতে সিলেট অঞ্চলে যে সুফিবাদী ইসলামের সূচনা হয়, তার বিস্তৃতির প্রয়ােজনে এ-ভাষার উদ্ভব। একদিকে ভিনভাষী ধর্মগুরু, অন্যদিকে অগণন সাধারণের। ধর্মান্তরের ফলে উভয়ের ভাষিক সংযােগের জন্য যেমন একটি মিশ্রভাষার প্রয়ােজন হয়, তেমনি এর লেখ্যরূপের দাবিতে দরকার হয় সহজ-সরল বর্ণমালার। এটি প্রধানত বৃহত্তর সিলেটি জনগােষ্ঠীর প্রয়ােজনে সৃষ্ট বলে নাম হয় সিলেটী নাগরী। প্রবাদ আছে, এমনকি গ্রামের নিরক্ষর নারীরাও এই বর্ণমালা মাত্র আড়াই দিনে শিখে বিভিন্ন পুথি সহজে পাঠ করতে পারতেন! এ-ভাষায় রচিত হয়েছে শত শত পুথি, আখ্যান আর হাজারাে গান—যা আজও বিপুল জনপ্রিয়। এই ভাষা ও ঐতিহ্যের এক সঘন বর্ণনা পাই নাগরী সাধক-গবেষক মােস্তফা সেলিমের সিলেটি নাগরিলিপি সাহিত্যের ইতিবৃত্ত বইয়ে। জনাব সেলিম কেবল নাগরী-গবেষক নন বরং একযুগ ধরে নাগরীর দুর্লভ-দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপিগুলাের সম্পাদনা, প্রকাশ ও প্রচারে রীতিমতাে যােদ্ধার ভূমিকায়। অবতীর্ণ। তাই এ-সময়ে নাগরীচর্চায় তিনি ও তাঁর উৎস প্রকাশন প্রায়-সমার্থশব্দ। তিনি তার এই সাধনানির্যাসে পূর্বজ গবেষকদের পথ ধরে নাগরীসংস্কৃতির ইতিহাস যেমন তুলে ধরেছেন, পাশাপাশি এর সৃষ্টি ও স্রষ্টাদের যথাযােগ্য মর্যাদায় তুলে। এনেছেন দৃষ্টান্তসমেত। আমাদের ভাষা-সাহিত্যের উপেক্ষিত এই অধ্যায়টি সম্পর্কে কেবল অজ্ঞতাই নয়, রয়েছে অনেক ভুল ধারণাও। মােস্তফা সেলিম তার বইটির ভেতর দিয়ে ইতিহাস-কর্তব্য পালন করে আমাদের চেতনাকেও জাগাতে চেয়েছেন।