ভাইয়ের মেয়ে ইন্দিরা দেবীকে বিভিন্ন সময় লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৪১ টি সহ মোট ১৫২টি চিঠিসমেত গ্রন্থ "ছিন্নপত্র"। এই চিঠিগুলোর প্রায় সবই রবিঠাকুর লিখেছেন পতিসর, শাহজাদপুর, বোয়ালিয়া আর শিলাইদহে বসে। সাল হিসেব করলে সে সব চিঠিই ১৯০০ সালের আগে লেখা। বুঝতেই পারছেন আমাদের রবীন্দ্রনাথ তখন বেশ ইয়াং! সেইসাথে ফ্লেভার পাবেন শতবর্ষ পূর্বের পূর্ববঙ্গের আদি ও অকৃত্রিম ছবির।
রবীন্দ্র রচনাবলীর স্বাদ আস্বাদন বেশি করিনি। "গল্পগুচ্ছ " আর কিছু প্রবন্ধ, উপন্যাসেই দৌড় সমাপ্ত এ অধমের। রবীন্দ্রনাথের লেখা নিয়ে ভয় কিংবা আলাদা মোহ কাজ করার দরুন অনেকেই অনেক বই পড়লেও রবিঠাকুর কে ঘাঁটান না। রবিঠাকুরের চিঠি পড়তে গিয়ে দেখলাম চিঠির রবীন্দ্রনাথের মনের সাথে গল্প,প্রবন্ধ আর ঔপন্যাসিক রবিঠাকুরের কোথায় যেন এক মস্ত অমিল আছে ভাষার গাঁথুনিতে। "ছিন্নপত্র"র লেখক এক আলাদা জগতের মানুষ যেন। ভাষার আর বাক্যের ওজনদার মিশেলে নাদান পাঠক এখানে নাকানিচুবানি খাবেন না। বরং জমিদার রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারি দেখাশোনার ছলে শিলাইদহ, পতিসর, বোয়ালিয়া আর শাহজাদপুরের প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্য আকন্ঠ পান নিচ্ছেন। গরিব কৃষক, অর্ধউলঙ্গ রাখাল, নদীর ধারে স্নানঘাট কিংবা সহজসরল রায়তের দৃষ্টি জীবনকে নিয়ে ভাবতে আরো বেশি বাধ্য করেছে রবীন্দ্রনাথকে। বজরায় চোষে বেরিয়েছেন পুরো অঞ্চল। শহুরে ঝঞ্ঝাট একপাশে ফেলে দু'চোখ ভরে দেখেছেন চারপাশ। তার প্রতিচ্ছবি এই বইয়ের প্রতিটি চিঠিতে আছে। রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন "ছিন্নপত্রে" বড় সোজাসাপ্টা। অথচ চিঠির কথাগুলো কত নিবিড়, কত বেশি সহজবোধ্যতার মোড়কে মোড়া তেতো সত্য তা পড়তে গিয়ে বুঝেছি।
এই বই পড়ে একটা বিষয় জলবৎ তরলং যে চিঠিতে ব্যক্তির ভেতরকার আলাদা এক সত্ত্বা আবির্ভূত হয়। সে ব্যক্তিমানুষের স্বাভাবিকতাকে ছাপিয়ে সন্ধান দেয় অন্য এক মানুষের।
যেকোনো সময় পড়বার মতো বই "ছিন্নপত্র"। জীবনকে সহজভাবে তুলে ধরা আলাদা এক রবিঠাকুরের বই "ছিন্নপত্র"।