'শিকারের বিচিত্র কাহিনি' আমার পড়া দেবীপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়ের পঞ্চম বই। বইটা এনথোলজি টাইপ - 'বাঘ ও বাঘিনী' এর মতই ছোট ছোট একাধিক কাহিনী নিয়ে লেখা - মোট বারোটি কাহিনী আছে।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'নর্দান রেঞ্জে বাইসন শিকার।' উড়িষ্যার আঙ্গুলে লেখকের বাইসন শিকারের কাহিনী। দলছুট বাইসন কেমন হিংস্র হয় তার উদাহরণ আছে দুইটা অভিজ্ঞতায় - দুটাই ক্ষ্যাপা বাইসনের আক্রমণে বীভৎস মৃত্যুর কাহিনী। লেখকের সঙ্গী শিবানী বাইসন শিকার করতে এসে প্রথমবারেই ব্যর্থ হন, আহত বাইসন হাত থেকে ছুটে যায় - তাকে মাইলের পর মাইল ফলো করেও ধরা সম্ভব হয়নি। এরপর অবশ্য পরপর দুটো দারুণ শিঙেল বাইসন তার হাতে আসে। এছাড়া সঙ্গীনির হাতে আহত ভাল্লুক শিকারের গল্প আছে। মানুষে অজগরে প্রাণপণ লড়াইয়ের একটা কাহিনীও আছে।
'শ্রেষ্ঠ ট্রফি' ও 'বাঘের ডাক' রম্য রচনা বলা যায়। প্রথমটাতে মাধবানন্দ নামের এক শিকারীর বউয়ের মন পাওয়ার (স্ত্রীর ভালোবাসাই শ্রেষ্ঠ ট্রফি - লেখকের মতে) গল্প, আর দ্বিতীয়টি বাঘের ডাক ছাড়তে গিয়ে টেপরেকর্ডার থেকে হিন্দি গান বের হয়ে নিশীথ জঙ্গলের মাঝে কি হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো সেটা নিয়ে লেখা।
বইয়ে বারবার এসেছে হাতি। 'ভেডেন ব্লকের খুনি', 'নাগাল্যান্ডে হাতি শিকার', 'পাগলা হাতি' আর 'ধলভূমের রোগ' - এ চারটা কাহিনী হাতি নিয়ে। সবই পাগলা বা দলছুট rogue হাতি নিয়ে। ধলভূমের হাতিটি দল থেকে বহিস্কৃত হয়ে রোগ হয়ে গিয়েছিলো, ফসল নষ্ট, গরুবাছুর মারা এবং শেষমেশ পানি আনতে যাওয়া মহিলাও বাঁচেনি তার হাত থেকে। যদিও বনবিভাগের বাঁধায় লেখক হাতিটা মারতে পারেননি।
পাগলা হাতির কাহিনীও কাছাকাছি। যদিও তার দল থেকে বহিস্কার হবার কোনো প্রমাণ নেই। ইতস্তত গরুবাছুর মারার পর এক বুড়িকে দেয়ালচাপা দিয়ে মেরে সে সকলের চক্ষুশূল হয়, এরপর সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় মারা পড়ে।
নাগাল্যান্ডের গল্পটা সুন্দর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা। ঘন জঙ্গল, অঝোর বৃষ্টি, ভ্যাপসা গরম, জাপানি বুলেট - আর হাতির পাল। সাথে পাঁঠা নিয়ে একটা মজার কাহিনীও আছে!
এর বাইরে আমার 'বাঁকা অরণ্যের মানুষখেকো চিতা' র কাহিনীটা ভালো লেগেছে। তিনশোর মত মানুষ খাওয়া একাধিক নরখাদক চিতাকে নিয়ে কাহিনী। স্থান উড়িষ্যার ভাগলপুর। দুটি রোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ আছে (চিতার বিবাদী ও সাঁওতাল রমণী শিকার)। এই চিতাগুলোকে সবংশে মারা সম্ভব হয়নি।
লেখকের ভুলে যন্ত্রণা পেয়ে পেয়ে মৃত্যুবরণ করা 'আহত বাঘ', গুহায় মাথা ঢুকিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাংকে 'ডিভোরের চিতা' শিকার, গাড়োয়ান খেকো 'বালিমেলার নরখাদক' চিতাকে জিপে বসে শিকার এবং গোখাদক চিতা ভেবে সারারাত কুকুরকে বন্দুক তাক করে বসে থাকার মতো 'শিকারে বিভ্রান্তি' - এই অভিজ্ঞতা গুলো আছে বইয়ের বাকি অংশজুড়ে।
'বাঘ ও বাঘিনী' র মত দুর্দান্ত লাগেনি। আবার খারাপও লাগেনি। সত্য শিকারকাহিনী যে সবসময় রোমাঞ্চকর হবে তা নয়। তাই কোনো অভিযোগ নেই। পার্সোনাল রেটিং ৩.৫/৫।