ভাষা মানুষের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। জন্মলগ্নে মানুষ যে ভাষায় প্রথম কথা বলতে শেখে, তা তার চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি ও স্বপ্ন প্রকাশের অবিচ্ছেদ্য মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপটে সিলেট অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব উপভাষা ও উচ্চারণরীতি এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সিলেটি উপভাষা কেবল একটি আঞ্চলিক রূপই নয়, বরং এটি এই জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক সজীব বাহক।
আহমেদ হাসান সংকলিত ও সম্পাদিত ‘সিলেটের উপভাষার শব্দকোষ’ গ্রন্থটি বাংলা ভাষার বিশেষ করে সিলেটি উপভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার এক সাহসী ও সময়োপযোগী প্রচেষ্টা। এই গ্রন্থে সিলেটি উপভাষার মৌলিক শব্দের পাশাপাশি আরবি, ফারসি, ইংরেজি, পর্তুগিজসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষার যে সকল শব্দ সময়ের আবর্তে আত্মস্থ হয়েছে, তা অত্যন্ত নিপুণভাবে সংকলিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ভারতীয় ও দেশীয় ভাষার প্রভাবে সৃষ্ট মিশ্রশব্দগুলোও এখানে স্থান পেয়েছে, যা উপভাষাটির বিবর্তন ও গতিশীলতাকে সুস্পষ্ট করে তোলে।
সিলেটি নাগরি লিপিতে লিখিত পুঁথি ও পাণ্ডুলিপির অনুবাদ ও লিপ্যন্তর করতে গিয়ে বহু অপ্রচলিত শব্দের সাথে গবেষকদের পরিচিতি ঘটে। সেই অভাব পূরণের লক্ষ্যেই এই শব্দকোষটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সংকলনটি কেবল শব্দের তালিকা নয়, বরং এটি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সংগ্রাহকের দীর্ঘদিনের শ্রম, নিষ্ঠা ও অনুসন্ধানপ্রসূত এই কাজটি ভাষাবিদ ও গবেষকদের কাছে এক অমূল্য তথ্যভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হবে।
পরিশেষে, এই বিশাল ও জটিল কর্মযজ্ঞটি সফলভাবে সম্পন্ন করার পেছনে সংগ্রাহকের একাগ্রতা ও ধৈর্য প্রশংসার দাবি রাখে। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, সিলেটি উপভাষার বিশাল শব্দভাণ্ডারের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র এখানে সংকলিত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক পরিসরে কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি তিনি রেখেছেন, তা এই অঞ্চলের ভাষা ও সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এই গ্রন্থটি সিলেটি উপভাষার সংরক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে এক মাইলফলক হিসেবে টিকে থাকবে।