পিয়ারু সরদার না থাকলে আমাদের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের প্রথম শহিদ মিনার গড়ে উঠত না। সে-মিনার অবশ্য আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে নেই, কেননা গড়ে-ওঠার পরই প্রতিক্রিয়ার শক্তি পাশবিকতার পরিচয় দিয়ে সে-মিনার চূর্ণ করে দিয়েছিল। তবে এদেশের মানুষের মনে সে-মিনার আজো অজার-অমর-অক্ষয় হয়ে আছে। যে-শহিদ মিনারে আজ আমরা পুষ্পের অর্ঘ্য নিবেদন করি, সে-মিনারও ধরে রেখেছে প্ৰথম শহিদ মিনারের স্মৃতি। ফুল দিয়ে অশ্রু দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে তৈরি শহিদ মিনার, ইট বালি-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি তো অবশ্যই সেসব উপকরণ এসেছিল পিয়ারু সরদারেরই কাছ থেকে আর শ্রদ্ধার উপটৌকন উৎসারিত হয়েছিল অগণিত মানুষের হৃদয় থেকে। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের অনেক অংশগ্রহণকারী একযোগে পিয়ারু সরদার সম্পর্কে এই বইটিতে লিখেছেন। তা থেকে সে-সময়কার একটি ছবি আজকের পাঠক খুঁজে পাবেন এবং জানবেন, একটা মুহূর্ত কীভাবে একজন ব্যক্তির জীবনকে পরিবর্তিত করে দেয় এবং পরিণামে জাতির জীবনে কত মূল্যবান হয়ে ওঠে।
ভাষা-আন্দোলনের সঙ্গে সঠিক পরিচয় ও সে-বিষয়ে সঠিক ধারণা খুব অল্প মানুষের মধ্যেই দেখা যায়, যদিও নানা ঘটনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেন এবং এ নিয়ে উচ্ছাস ও আবেগ প্রকাশ এক সাধারণ ব্যাপার। প্রথমদিকে প্রায় সকলেই মনে করত, ভাষা-আন্দোলন শুধু ছাত্র ও কিছু শিক্ষিত লোকের আন্দোলন। এখনও অধিকাংশ লোকের ধারণা তাই। ১৯৪৭-৪৮ সালে ভাষা-আন্দোলন মুষ্টিমেয় ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীর দ্বারা শুরু হলেও ১৯৪৮ সালে এতে সাধারণ মানুষ ও রেল শ্রমিকদের কিছু অংশগ্রহণ ছিল। তবে ওই প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকার স্থানীয় জনগণের বিশেষ কোনো সমর্থন ভাষা-আন্দোলনের প্রতি ছিল না। উপরন্তু তার প্রতি তাদের ছিল এক ধরনের বিরূপ মনোভাব। তাঁরা তখন মুসলিম লীগের রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।