‘সমুদ্র দেখিবার সাধটা নীলার ছেলেবেলার! কিছুদিন স্কুলে পড়িয়াছিল। ভূগোলে পৃথিবীর স্থলভাগ আর জলভাগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আছে। কিন্তু তার অনেক আগে হইতে নীলা জানিত পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল। সাত বছর বয়সে বাবার মুখে খবরটা শুনিয়া কী আশ্চর্যই সে হইয়া গিয়াছিল। এ কি সম্ভব? কই, সে তো রেলে চাপিয়া কত দূরদেশে ঘুরিয়া আসিয়াছে, মামাবাড়ি যাইতে সকালবেলা রেলে উঠিয়া সেই রাত্রিবেলা পর্যন্ত ক্রমাগত হু হু করিয়া ছুটিয়া চলিতে হয়, কিন্তু নদীনালা খালবিল ছাড়া জল তো তার চোখে পড়ে নাই। চারিদিকে মাঠ, মাঝে মাঝে জঙ্গল, আকাশ পর্যন্ত শুধু মাটি আর গাছপালা।...’
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী জুড়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটময় মূহুর্তে বাংলা কথা-সাহিত্যে যে ক’জন লেখকের হাতে সাহিত্যজগতে নতুন বৈপ্লবিক ধারার সূচনা হয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাদের অন্যতম। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। জন্ম ১৯মে ১৯০৮ বিহারের সাওতাল পরগনা রাজ্যের দুমকা শহরে।
মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ইত্যাদিই ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু। জীবনের অতি ক্ষুদ্র পরিসরে তিনি রচনা করেন বিয়াল্লিশটি উপন্যাস ও দুই শতাধিক ছোটোগল্প। সমুদ্রের স্বাদ তার রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ছোটগল্পগ্রন্থ। যেখানে স্থান পেয়েছে সমুদ্রের স্বাদ, ভিক্ষুক, পূজা কমিটি, আফিম, গুণ্ডা, কাজল, আততায়ী, বিবেক, ট্রাজেডির পর, মালি, সাধু, একটি খোয়া, মানুষ হাসে কেন শিরোনামের ১৩টি ছোটগল্প।
নুসরাত প্রকাশনী থেকে পুনর্মুদ্রিত অত্র গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন ড রহমান হাবিব। গ্রন্থটিতে যুক্ত হয়েছে লেখকের জীবনপঞ্জি ও গ্রন্থপঞ্জি। গ্রন্থের শুরুতেই গুরুত্ববহ ভুমিকা লিখেছেন রহমান হাবিব। ছোট এই ভুমিকাটিতে আছে পুরো গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন।
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৩রা ডিসেম্বর, মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী এই কথাসাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে।