"নির্বাচিত কবিতা" ফ্ল্যাপে লেখা কথা:
“শামস আল মমীনের ‘লি শেন’ কবিতাটি পড়ে কেন যেন আমি অস্থির হয়ে উঠেছিলাম, আমার মনে হয়েছিল ছুটে যাই লি শেনের কাছে যে একা, বিচ্ছিন্ন বা
‘তোমাদের জন্য রেখে যাব ভরা নদী, খালবিল
নদী ও হাওরের কিলবিল মাছ
রেখে যাব শস্যক্ষেত
ধনেপাতার নরম গন্ধ’।
শামস আল মমীন। আপাদমস্তক কবিতায় নিবেদিত এক প্রবাদ পুরুষ। তার কবিতা প্রথম পড়েছিলাম ‘মাসিক নতুনধারা’য়। এবং সেই থেকে আমি পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম একজন শামস আল মমীনের সাথে। তার কবিতার কল্পভুমে বিচরণ করতে করতে অনেক জেনেছি তাকে, তার কবিতাকে।
তার ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থটি হাতে পেয়ে আমার কাছে আজ সেই অনেক অনেক দিন আগের শামস আল মমীনকে একটু অপরিচিতই লাগছে। কবির বয়স বাড়ে। পাল্টায় কবিতার রূপকল্প। আর তাই আমারও মনে হয় হ্যাঁ তাইতো- ‘একটি সম্পূর্ণ দুপুর রোদের ভিতরে লুকিয়ে ছিল/ একটি সম্পূর্ণ রাত এক নিঃশ্বাসে হারিয়ে গেল’...।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় কবি শামস আল মমীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না’। বাংলা ভাষাভাষী কাব্যপ্রেমীরা বেশ সানন্দেই গ্রহণ করেছিল তখন ‘চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না’কে। বাচিকশিল্পীদের কণ্ঠেও আশ্রয় পায় কবির অসংখ্য কবিতা। আর এরপর থেকে, কবির ভাষায়- ‘আমি নদীর শান্ত স্রোতের মত কবিতা লিখে যাই’।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে প্রকাশিত হয় কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মনোলগ’। ব্যক্তিগত জীবনের লাভক্ষতির হিসেব মেলাতে গিয়ে কবিতাকে ঠকিয়েছেন অনেকদিন। কিন্তু কবিতার সাথে কবির যে নাড়ির টান, তা কি ছিড়ে ফেলা যায়? শেষপর্যন্ত কবি তাই কবিতার কাছেই ফিরে আসেন সমর্পিত চিত্তে। ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় কবির তৃতীয় গ্রন্থ ‘সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা’। তারপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে- ‘আমি সেই আদিম পুরুষ’, ‘আমি বন্দী খোলা জানালার কাছে’, ‘কেউ হয়তো আমাকে থামতে বলবে’ নামক কাব্যগ্রন্থগুলি।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭ তে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত কবিতা’ নামক এই গ্রন্থটিই কবি শামস আল মমীনের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ। অন্যভাবে বললে বলা যায় এটি একটি কাব্যসংকলন। ১৪১টি কবিতা নিয়ে গড়ে ওঠা এই কাব্যসংকলনে স্থান পাওয়া সবগুলো কবিতাই সুনির্বাচিত। চমৎকার প্রচ্ছদের জন্য শিবু কুমার শীলকে ধন্যবাদ।
‘নির্বাচিত কবিতা’র একমলাটে প্রিয় সব কবিতার এমন আয়োজনে সাঁতার কাটতে কাটতে কখনো ফিরে যাই আমাদের বাড়ির সামনে। আর ‘আলোক ছড়ানো সাঁঝে আজানের দীর্ঘ সুর শুনি’।
‘এখানে এলেই শীতল বাতাস উঁকি দিয়ে যায়/ কারা যেন নীরবে ছড়ায় কামিনীর ঘ্রাণ/ পথে পথে ফেলে রাখে ব্যথিত বকুল...’। সুদূর নিউইয়র্কে বসে একজন কবির ‘স্মৃতি’তে প্রিয় মাতৃভূমির এমন চিত্র ভেসে উঠবে এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু কবি শামস আল মমীন যেন নিউইয়র্কের ওপারে বসেই তৃষ্ণায় তাকিয়ে থাকেন ভাঙা বাড়িটার দিকে, বিষণ্ণ ক্ষেতের মতো।