কবিতায় কবির বেদনার স্বাক্ষর থাকে। এ বেদনা হতে পারে বহুমাত্রিক। কবিতায় তা মূর্ত করে তোলার সক্ষমতার ভেতরেই কবির প্রধান সার্থকতা নিহিত। চলতি বইমেলায় প্রকাশিত মহাদেব সাহার ‘মাটির সম্ভার’ কাব্যগ্রন্থে দেখা যায় বেদনার স্বাক্ষর। এ বেদনা বহুমাত্রিক হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বদেশের স্মৃতি। এই স্মৃতি আলোচ্য গ্রন্থের কবিতাগুলোর প্রত্যেক ছত্রে সঞ্চারিত। কবিতার ছত্রে সঞ্চারিত এসব বেদনা মন্থন আর স্মৃতিগুলো সহজেই পাঠকের মনন ও স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
এই একাত্মতার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় মহাদেব সাহা সেই কবি, যিনি আজ বহু বছর হলো জনপ্রিয়। পাঠকের মননের সঙ্গে এই একাত্মতার জন্য তিনি সহজেই সঞ্চার করতে পারেন তাঁর লুকানো অশ্রু। বেদনাবিধুর একেকটি পঙিক্ত নিয়ে মাটির সম্ভার সন্নিবেশিত। বেদনাহত কবির মনে প্রতি মুহূর্তে জেগে ওঠে মাতৃভূমির পবিত্র স্মৃতি, মাতৃভূমির ধূলিকণার পবিত্র স্পর্শ। এই স্পর্শ কবিকে শিহরিত করে। কবি যেন স্বপ্নচালিত হয়ে যান। আর খুঁজে বেড়ান সেই মাটির গন্ধ, ডুবে যেতে চান হারানো অনুষঙ্গের গভীরে ‘আমার হাতে জোনাকিগুলি সব তারার মতো ফুটে আছে/মেলে ধরো দেখবে সন্ধ্যার আকাশ,/বুকে দ্যাখো কণকচাঁপার গন্ধ, চোখে বর্ষার মেঘ/এই সব নিয়ে আমি আটলান্টিক পার হয়ে এসেছি;/দীর্ঘ জলপথে আমার সাথে এসেছে একঝাঁক ইলিশ/গাঙশালিকের পাখার শব্দ, জলফড়িংয়ের নৃত্য,/দুপুরবেলার উদাস ঘুঘু পাখির ডাক,/এই চিত্রশালা বুকে নিয়ে আমি এত দূর চলে এসেছি;/আমার বুকের মধ্যে দ্যাখো বাউল গানের মূর্ছনা/ভোরের টুপটাপ শিশির-পড়া, আমি সাথে নিয়ে এসেছি জ্যোত্স্না আর ঝাউবন;/অমি যখন আসি তখন পিছু ডাকতে থাকে দুটি টুনটুনি পাখি/ জাঙাল বেঁধে পিঁপড়েগুলি সব পিছে পিছে ছুটতে থাকে,/আমার দুই চোখ হয়ে ওঠে ভাদ্র মাসের ভেজা বন/আমি আটলান্টিক পার হয়ে এসেছি বুকে নিয়ে/ এই মাটির সম্ভার (মাটির সম্ভার)