তা’লীমুদ দ্বীন’ হযরত থানভী রহ. রচিত অপূর্ব এক কিতাব। হাদীসের গ্রন্থসমূহের বিষয়-তালিকা উল্টিয়ে দেখলে যেখানে ‘কিতাবুল ঈমান’ (ঈমানের আলোচনা) ‘কিতাবুস সালাত’ (নামাযের আলোচনা) ‘কিতাবুয যাকাত’ (যাকাতের আলোচনা) দৃষ্টিগোচর হবে, তার নিচেই ‘কিতাবুল বুয়ু’ (বেচা-কেনার আলোচনা) ‘কিতাবুন নিকাহ’ (বিবাহের আলোচনা) ‘কিতাবুত তালাক’ (তালাকের আলোচনা) ‘কিতাবুল আদাব’ (আদবের আলোচনা) ও ‘কিতাবুর রিকাক’ (মন ও হৃদয় বিগলিত করে এমন হাদীস সমূহের আলোচনা) পরিদৃষ্ট হবে। বিধায় এরূপ ধারণা পোষণের সুযোগ কোথায় যে, ইসলাম কেবল আকীদা ও আমল শিখিয়েছে? মু‘আমালাত, মু‘আশারাত ও তাসাওউফ শিক্ষা দেয়নি। বরং উপরের আলোচনা দ্বারাই নিষ্ঠাবান ব্যক্তির বিশ্বাস হয়ে যাবে যে, ইসলাম পাঁচটি বিষয়েরই শিক্ষা দান করেছে। ইসলাম আমাদের কারো মুখাপেক্ষী করে রাখেনি। বরং বিজাতিদের মধ্যেও এমন নিষ্ঠাবান লোক রয়েছেন, যারা নিজেরাই ইসলাম থেকে শিক্ষার আলোলাভের স্বীকৃতি প্রদান করে থাকেন।
মোটকথা, যখন এ ভ্রান্ত ধারণা বিশ্বব্যাপী বিস্তার হতে এবং সর্বশ্রেণির লোকের এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গেল, তখন ইসলামী সহমর্মিতা ও ভ্রান্তির সংশোধন এ বিষয়ে এমন একটি পুস্তিকা রচনা করার দাবি উত্থাপন করল, যার মধ্যে উপরিউক্ত পাঁচ বিষয়কে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সংগ্রহ করে সংক্ষেপে প্রয়োজন পরিমাণ সংকলন করা হবে। এ পুস্তক দ্বারা সমস্ত মুসলমানকে উপকৃত করার লক্ষ্য তো আছেই, তবে বিশেষত আধ্যাত্মিকতার পথের পথিকদের বিদগ্ধ হৃদয়ের আবেদন পূরণ করাই অধিকতর লক্ষ্য। তাই প্রত্যেক মুসলমানের ব্যাপকভাবে এবং আধ্যাত্মিকতার পথের পথিকদের বিশেষভাবে এ বই অধ্যয়ন করা এবং অল্প অল্প করে প্রতিদিন নিয়মিত ওযীফারূপে পাঠ করা জরুরি।
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং এর গন্ডি পেরিয়ে যিনি হাজারো মানুষকে দিয়েছেন আত্মশুদ্ধি ও তাসাওউফ এর শিক্ষা। যার কারণে তাঁর উপাধি ছিলো ‘হাকীমুল উম্মাত’ বা উম্মাহর আত্মিক চিকিৎসক। উপমহাদেশে মুসলমানদের মাঝে সুন্নতের জ্ঞান প্রচারে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ‘দাওয়াতুল হক’ এর অবদানের জন্যও প্রসিদ্ধ মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর নাম। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী ১৯ আগস্ট, ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে (রবিউস সানী ৫, ১২৮০ হিজরী) ভারতের উত্তর প্রদেশের থানাভবনে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই হাফেয হোসাইন আলী রাহ.-এর কাছে সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর শিক্ষাজীবন। নিজগ্রামেই ছোটবেলায় হযরত মাওলানা ফতেহ মুহাম্মদ থানভী রাহ.-এর কাছ থেকে আরবি ও ফার্সি ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১২৯৫ হিজরীতে তিনি দারূল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের উচ্চতর শাখাগুলোয় বিচরণ করার আগ্রহে। সেখানে তিনি পাঁচ বছর হাদীস, তাফসীর, আরবি সাহিত্য, ইসলামী দর্শন, যুক্তিবিজ্ঞান, ইসলামি আইন এবং ইতিহাস বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। দেওবন্দে শিক্ষার অধ্যায় সমাপ্ত করে মক্কা মুকাররমায় মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কীর কাছে কেরাত ও তাজবীদ শেখেন। তিনি কানপুরের একটি মাদ্রাসায় মাত্র ২৫ টাকা বেতনে শিক্ষকের পদ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কানপুরের টপকাপুরে জামিউল উলূম মাদ্রাসার প্রধান পরিচালকের আসন অলংকৃত করেন এবং দীর্ঘ ১৪ বছর সেখানে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে তাঁর শিক্ষক হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কীর রহ. পরামর্শে তিনি থানা ভবনের খানকাহে ইমদাদিয়ায় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। সারা জীবনে আশরাফ আলী থানভী এর সকল বই এর হিসেব করতে গেলে ছোট-বড় মিলিয়ে তা সাড়ে বারো হাজার ছাড়িয়ে যায়। হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর বই সমূহ এর মধ্যে ফিকাহ বিষয়ক বই ‘বেহেশতী জেওর’ উপমহাদেশের মুসলমানদের মাঝে বহুল পঠিত। এছাড়া তাঁর রচিত কুরআন শরীফের উর্দু তরজমার গ্রন্থ বয়ানুল কুরআনও (কুরআনের ব্যাখ্যা) এর ভাষা ও ব্যখ্যাশৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ। হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর বই সমগ্র এর স্বত্ত্ব তিনি জাতির কল্যাণে উন্মুক্ত করে রেখে গেছেন। জুলাই ১৯, ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে (১৬ রজব, ১৩৬২ হিজরী) আল্লামা থানভী রহ. তাঁর জন্মস্থান থানা ভবনেই মৃত্যুবরণ করেন।