লেখক বিনয় ঘোষ বাংলার গ্রামের মানুষ, গ্রামের সমাজ, গ্রামের জীবনযাত্রা, গ্রামের সংস্কৃতি স্বচক্ষে দেখতে দেখতে বারংবার মনে করতে চাইলেন, পণ্ডিতেরা উনিশ শতকে বাংলার যে রেনেসাঁস বা নবজাগরণের কথা বলেন, সেটা কি পদার্থ? কোথায় এবং কখন ‘জাগরণ’ হল? জাগল কারা? কলকাতা শহর যদি ‘নবজাগৃতিকেন্দ্র’ হয়, যদি রেনেসাঁসের সূর্য ‘জ্যোতির কনকপদ্মের’ মতো কলকাতার আকাশে উদিত হয়ে থাকে, তাহলে কলকাতার খুব কাছাকাছি গ্রামেও, দেড়শো বছর পরেও, কেন অমাবস্যার রাতের মতো অন্ধকার? কেন অতীতের ছেঁড়াকাঁথায় শুয়ে গ্রামের মানুষ আজও গভীর ঘুমে অচৈতন্য? কেন পৌরাণিক যুগের স্বপ্নের ঘোরে আজও তাদের স্বপ্নচারিতা? এই সমস্ত প্রশ্ন, কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু সংশয় নিয়ে লেখা তাঁর বই ‘বাংলার নবজাগৃতি’।আমাদের দেশের ঐতিহাসিকরা ইতিহাসচর্চা শিখেছেন ইংরেজদের কাছ থেকে। নৃবিদ্যা প্রত্নবিদ্যা ইত্যাদির সাহায্যে ভারতের সুদূর অজানা অতীতের ইতিহাস, প্রধানত ইংরেজদের অভিভাবকত্বে, পুনরুদ্ধৃত হয়েছে। একথা সত্যের খাতিরে অস্বীকার করা যায় না। এদিক থেকে বিদ্যানুরাগী কয়েকজন ইংরেজের কাছে আমরা ঋণী, যেমন কানিংহাম, মার্শাল, বেগলার, হাটন এবং আরও অনেকে। কিন্তু ‘আধুনিক’ যুগের ইতিহাস অনুশীলনের ক্ষেত্রে ইংরেজরা নানাদিক থেকে এদেশীয় ঐতিহাসিকদের বিচার-বুদ্ধিকে ঘোলাটে-ধোঁয়াটে করে দিয়েছেন। উপনিবেশিক বুদ্ধিজীবীর মতো আমরা ইংরেজদের গুরুগিরি অন্ধের মতো মেনে নিয়েছি। আধুনিক যুগ মানে ইংরেজ শাসকদের যুগ, তাই আধুনিক যুগের ইতিহাস-ব্যাখ্যায় শাসকরা আমাদের বুঝিয়েছেন যে তাঁরাই আধুনিকতার ভগীরথ এবং আধুনিকতা মানে প্রগতি অগ্রচিন্তা, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার-মুক্তি, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অগ্রগতি, যার গাণিতিক যোগফল হল ‘নবজাগৃতি’, যেমন ইয়োরোপের ‘রেনেসাঁস’ সেইরকম। এই নবজাগৃতিকে ঘিরেই রচিত হয়েছে এই মূল্যবান বইটি।