বেদনা মরে যায়নি, অসাড়ও হয়ে যায়নি সুতপার। জীবনের দুঃখবোধ মৃত্যুচিন্তা, নিরন্তর কান্না হয়ে আছে সে শুধু নিজের মধ্যেই। অগ্নিগর্ভ বাসনা প্রতিনিয়ত আমন্ত্রণ করেছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠদের একজন
এটি নাসরীন জেবিনের উপন্যাস। গ্রন্থের শিরোনামই বলে দেয় এটি একটি অন্য রকম প্রেমের উপন্যাস। সুতপা নামক একটি মেয়ে বা নারীর অন্য রকম জীবন নিয়ে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস। এ সম্পর্কে গ্রন্থের প্রথমেই বলা হয়েছে : ‘বাস্তবতাই জীবনের সত্যনিষ্ঠ শেকড়। যে শেকড়কে ধরে সুতপা আত্মমুক্তির সন্ধানে ছুটেছে। ভদ্র জীবনের সুন্দর-মহৎ সমাজ-মানসকে সে অনুধাবনের চেষ্টা করেছে। ভালবাসার প্রথম আশ্রয় ছিল বাবা- যে তার মানসিক প্রাগসর চেতনাস্তরকে স্পর্শ করেছিল। পরবর্তী ভালবাসা সুতপার জীবনসত্যকে স্পর্শ করেছে। তাই সে বলতে পেরেছিল- ভালবাসি, তোমাকেই আমি ভালবাসি। এরপর দীর্ঘ যন্ত্রণা, খসে পড়া স্বপ্ন নিয়ে এগিয়েছে সে। জীবনে চাওয়া-পাওয়ার মৃত্যু ঘটলেও জয়ী হয়েছিল সে জীবন-যুদ্ধে, যে যুদ্ধ অমিত সম্ভাবনার মুক্ত আকাশ, জীবন মুক্তির স্বাদ এনে দিতে পারে’। খুবই স্পর্শকাতর জীবন সুতপার। এক আদর্শ শিক্ষক পিতার কন্যা সে, যে দেখতে অত্যন্ত সুন্দর, পড়াশোনায় মেধাবী কিন্তু চাওয়ার চেয়ে পাওয়ার দ্বন্দ্বে সে ছিটকে পড়ে জীবন থেকে। গোবরে পদ্মফুল এক যুবককে সে ভালবাসে, কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যা সুতপা তার বাবার আদর্শ ও ভালবাসাকে লালন করতে গিয়ে যুবক শুভ্রর সঙ্গে ওর আর সম্পর্ক না। বাবা তাকে বিয়ে দেয় এক ধনাঢ্য ও অসংস্কৃতিবান অন্য যুবকের সঙ্গে, যেখানে সুতপা তার লালিত স্বপ্ন ও আদর্শ নিয়ে একদমই বেমানান, তথাকথিত হাই সোসাইটির গণ্ডিতে সে দিন দিন অস্থির ও যন্ত্রণার বেড়াজালে আটকে যায়। কিন্তু বাবার আলো তাকে পরাজিত হতে দেয় না। কারণ সে একজন শিক্ষিত নারী, সে একজন সঙ্গীত শিল্পী, সে পরাজিত হবার মানুষ নয়। সে বেছে নেয় শিক্ষকতা, সঙ্গীত আর মনে মনে বাবার প্রতি হয় প্রবল অভিমান। এদিকে বাবাও মেয়ের কষ্টে ধুকে ধুকে নিঃশেষিত হন। লিখে যান একটি স্মরণীয় চিঠি, যে চিঠি সুতপা উদ্ধার করে তার বাবার মৃত্যুর পর। যে বাবা তাকে প্রাণের চেয়েও ভালবাসত, সেই বাবার চিঠি হাতে নিয়ে নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। বলতে পারি, সাদা-মাটা, সস্তা কাহিনী ছাপিয়ে নাসরীন জেবিনের এই উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে জীবনঘনিষ্ঠ ও ভিন্নমাত্রার।