তিতাস একটি নদীর নামঃ বুক মিভিউ
কম দাম দেখে বাংলা একাডেমীর বই নিয়েছিলাম। সুন্দর বাধাই সুন্দর মোলাট। ভূমিকা ছত্রিশ পৃষ্ঠা। সেই তিতাস, দুষ্টু পল্লীবালক তাকে সাতরাইয়া পার হইতে পারেনা। আবার ছোট নৌকায় ছোট বউ নিয়া মাঝি কোনদিন ওপারে যাইতে ভয় পায় না।
নদীর কি সুন্দর বর্ননা। বাংলার বুকে জটার মতো নদীর প্যাচ। সাদা, ঢেউ তোলা জটা। কোন মহাস্থবিরের চুম্বন রস সিক্ত বাংলা। তার জটগুলি তার বুকের তারুণ্যের উপর দিয়া সাপ খেলানো জটিলতা জাগাইয়া নিম্নাঙ্গের দিকে সরিয়া পড়িয়াছে। এ সবই নদী।
গাড় অন্ধকার। নৌকা, হারিকেন শিখা টিমটিম করে দুলছে। দাড়ের আঘাতে সেই ছায়া শতবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নদীর কথা চিন্তা করলে এই মনে পড়ে। আগে অনেক আগে তখন ট্রেনে রাতে স্টিমার পার হতে হত। লাল লাল স্টিমার, লাল জামা পড়া কুলি। কোনদিন জাল নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া দুরের কথা খালে বিলে সাকো টাকোও পার হইনি।
তিতাসের পারের জীবন, তার মাঝে তিতাস, থালা ভরা তারা। সবই জীবন।কিশোর সুবলা, বাসন্তী, অনন্ত। সবই সে সময়ের পুতুল। কি সুন্দর ছাইলা হইলে পাচ ঝাড় জোকার, মাইয়া হইলে তিন ঝাড়ু। ছয় দিনে দোয়াত কলম, অষ্টম দিনে আট কলাই। তের দিন পর অশৌচ অন্ত। তারপরে পঞ্জিকা দেখে অন্নপ্রাশন। এই ছিল মালোপাড়ার রীতি। নদীই তাদের জমি, জমা। আমার সবারই তো গল্প আছে। সবার গল্পই সবার কাছে সেরা মনে হয়। নীল আকাশ, পেজা তুলার মেঘ, তারপাশে সবুজ পাতা, ৬ টি পাতা পরে এক টুকরো পলাশ। জানালার গরাদ, ফ্যানের বাতাসে পরদার কেপে কেপে উঠা। এতটুক তো আমিও লিখি কিন্তু কই শিল্পিত তা হয়না।
শেষে বলি আমি ভেবেছিলাম হয়তো তিতাস পাড়ের মানুষের জীবন দিয়েই হয়তো গল্প শেষ হবে। হয়তো অনন্ত অনন্তবালার স্বপ্ন দেখিয়ে তিতাস যমুনায় মিশবে। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম উপন্যাসের মুল নায়ক তো তিতাস নদী। সেই নায়ক মরিয়া গেলে আর সবই তো মিশিয়া যায়। মালোপাড়া মিশিয়া যায়, ঘর বাড়ি উঠান শূন্য পড়িয়া থাকে, জাল খালি উঠিয়া আসে। এখন যা স্বচক্ষে দেখি, অনেক আগেই লেখক তা দেখে গেছেন। সেই সংস্কৃতি হারানো থেকে শুরু। তারপরে একে একে সব গেল। আমরাও তো বিদেশী, ভারতীয় সংস্কৃতির কাছে সব হারাতে শুরু করেছি। না জানি কবে আমাদের তিতাস রুপ নদীটা হারিয়ে যায়। মনের মধ্যে দাগ কাটার মত উপন্যাস।