"তাফহীমুল কুরআন ১৬শ খণ্ড "বইটির সম্পর্কে কিছু কথা:
কুরআন মজিদ বুঝার জন্যে তাফসীরের সাহায্য নেয়া অত্যাবশ্যক। এ কারণেই সেই প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত লেখা হয়েছে আল কুরআনের অসংখ্য তাফসীর।
আধুনিক কালে ইসলামী পুনর্জাগরণের নকীব আল ইমাম আল উস্তায সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী রহ.-এর অমর অবদান তাফসীর তাফহীমুল কুরআন'। কুরআন মজিদ বুঝার জন্যে এটি একটি বাস্তবধর্মী সহজ তাফসীর। এই অনবদ্য তাফসীর গ্রন্থের শুরুতে তিনি একটি অসাধারণ ভূমিকা লিখেছেন। কুরআনের মর্ম উপলব্ধির ক্ষেত্রে এটি একটি আলােক বর্তিকা। সূরার শুরুতে প্রতিটি সূরার বিষয়বস্তু সংক্রান্ত ভূমিকা প্রদান করে তিনি সূরার মধ্যে প্রবেশ করার পূর্বেই পাঠককে সূরাটি সম্পর্কে মৌলিক ধারণা লাভ করার সুযােগ করে দিয়েছেন। তারপর রেওয়ায়াত ও দেরায়াতের নিরিখে আয়াতসমূহের। যুগােপযােগী তাফসীর করে পাঠকগণের জন্যে কুরআনের মর্মবাণী বুঝার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। অপরদিকে তিনি কুরআনুল হাকিমের তাত্ত্বিক ও আইনগত আয়াতসমূহের এমন অকাট্য দলিল ও যুক্তি ভিত্তিক তাফসীর করেছেন, যা তাফসীর শাস্ত্রের ইতিহাসে অসাধারণ। ব্যাখার ক্ষেত্রে তিনি একদিকে যেমন অতীতের মশহুর ও মকবুল মুফাসসিরগণকে অনুসরণ করেছেন, অপরদিকে আধুনিক কালের মননশীলতাকে প্রভাবিত করার মতাে যুক্তি প্রমাণকেও ধারণা করেছেন।
এ তাফসীর গ্রন্থটি বিশেষ ও নির্বিশেষ সকল পাঠকের হৃদয়ে কুরআনের প্রতি কৌতুহল সৃষ্টিকারী এক অনন্য তাফসীর। এ গ্রন্থটি তার পাঠকগণের হৃদয়-মনকে কুরআনের শিক্ষা, মর্মবাণী ও হিদায়াতের অনুসরণে উদ্বুদ্ধকারী এক মর্মস্পর্শী তাফসীর। এ তাফসীর তার পাঠকগণের অন্তরে আল্লাহর বাণী বুঝার, আল্লাহর হুকুম মেনে চলার এবং আল্লাহ প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োেগ করার দুর্বার প্রেরণা জাগিয়ে তােলে।
উর্দু ভাষায় লেখা এ খ্যাতনামা তাফসীর গ্রন্থটি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। L ঢাকাস্থ সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী তাফসীর গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে ।
প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেছে। আলহামদুলিল্লাহ এ গ্রন্থটির পাঠক চাহিদা খুবই ব্যাপক। উর্দু Tছয় খণ্ডের গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় উনিশ খণ্ডে প্রকাশ করা হয়েছে। অবশ্য ছয় জিলদেও প্রকাশ হয়েছে।
পূর্বে সাধু বাংলায় অনূদিত হওয়ায় সহজ সরল ভাষায় সাধারণ পাঠকদের উপযােগী করে তাফহীমুল কুরআনের অনুবাদ করার দাবি চলে আসছিল। বহু চেষ্টা সাধনার পর সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী সে উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে নতুন অনুবাদ কাজ সম্পন্ন| করা হয়। সে সময় একাডেমীতে কর্মরত রিসার্চ স্কলার মাওলানা আবদুল মান্নান তালিব ও অধ্যাপক মাওলানা মােজাম্মেল হক অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে এ অনুবাদ কাজ করেন। অনুবাদ সম্পন্ন হওয়ার পর একাডেমীর তৎকালীন চেয়ারম্যান বহু ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ মরহুম আব্বাস আলী খান এবং হাফেজ আকরাম ফারূক সমগ্র অনুবাদ কর্মটি সম্পাদনা করেন।
একাডেমীর সাথে চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক প্রকাশনী তাফহীমুল কুরআন প্রকাশ করে আসছে। অনুবাদ সম্পাদনা হওয়ার পর নতুন কম্পােজ করে প্রকাশ করতে গিয়ে কোথাও কোথাও কিছু বিচ্যুতি ঘটে। সময়। পরিক্রমায় সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী কর্তৃপক্ষ তাফহীমুল কুরআনের অনুবাদকে নতুন করে সম্পাদনার প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সে প্রেক্ষিতে তাফহীমুল কুরআনের অনুবাদ নতুন করে সম্পাদিত হলাে। এবার আমাদের তত্ত্বাবধানে সম্পাদনা করেছেন মাওলানা মুহাম্মদ মূসা।
আশা করি বিদগ্ধ পাঠকগণ বঙ্গানুবাদ পড়ে মূল তাফহীম পড়ার মতােই উপলব্ধি করবেন। তাফহীমের নতুন অনুবাদ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করায় কালামেপাক নাযিলকারী আল্লাহ রাব্বল আলামীনের লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করছি এবং তার দরবারে দোয়া করি তিনি যেনাে এ অনুবাদের মাধ্যমে সঠিকভাবে কুরআনের মর্ম অনুধাবন করতে পাঠকবর্গকে সাহায্য করেন। আমীন।
সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী (উর্দু: ابو الاعلیٰ المودودی; ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ – ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৯) - ছিলেন একজন ইসলামী পণ্ডিত, ইসলামপন্থী মতাদর্শী, মুসলিম দার্শনিক, আইনবিদ, ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক, কর্মী এবং গবেষক, যিনি ব্রিটিশ ভারত এবং পরবর্তীতে দেশভাগের পর পাকিস্তানে সক্রিয় ছিলেন। উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ তাঁকে "আধুনিক ইসলামের সবচেয়ে সুসংবদ্ধ চিন্তাবিদ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অসংখ্য রচনা, যা "কুরআন ব্যাখ্যা, হাদিস, আইন, দর্শন এবং ইতিহাসের মতো বিভিন্ন শাখা আবৃত করে, যেগুলো উর্দুতে লেখা হয়েছিল, কিন্তু পরে ইংরেজি, আরবি, হিন্দি, বাংলা, তেলুগু, তামিল, কন্নড়, বর্মি, মালয়ালম এবং আরও অনেক ভাষায় অনূদিত হয়। তিনি ইসলামকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং "প্রকৃত ইসলাম" বলতে তিনি যা বুঝেছিলেন তা প্রচার করতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ইসলাম রাজনীতির জন্য অপরিহার্য এবং শরিয়া প্রতিষ্ঠা করা ও রাশেদুন খলিফাদের শাসনের সময়কার মতো ইসলামিক সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের মতো পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব থেকে উদ্ভূত অনৈতিকতা পরিত্যাগ করা প্রয়োজন। তিনি ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মওদুদী এবং জামায়াতে ইসলামী সক্রিয়ভাবে ভারত বিভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ভারত ভাগের পর মওদুদী এবং তাঁর অনুসারীরা ইসলামের রাজনৈতিকীকরণ এবং পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র বানানোর জন্য সমর্থন তৈরির দিকে মনোযোগ দেন। ধারণা করা হয় যে, তারা জেনারেল মুহাম্মদ জিয়াউল হককে পাকিস্তানে ইসলামীকরণ প্রবর্তন করতে সাহায্য করেছিলেন এবং তাঁর প্রশাসনের সময় বিচার বিভাগ ও বেসামরিক চাকরিতে হাজার হাজার সদস্য ও সমর্থককে চাকরি দেওয়ায় তারা জিয়াউল হকের দ্বারা ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে মওদুদী ইসলামে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সেবার জন্য সর্বপ্রথম সৌদি আরবের কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কারের প্রাপক হন। তিনি সৌদি আরবের মদিনা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় অংশ নিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম ব্রাদারহুড, ইসলামিক সার্কেল অফ নর্থ আমেরিকা, হামাস এবং অন্যান্য অনেক সংস্থা মওদুদীর কাজের প্রশংসা করে।